এই আয়াতটি কুরআনের সবচেয়ে ভয়ংকর আয়াতগুলোর একটি। কারণ এখানে শুধু বাহ্যিক শাস্তির কথা বলা হয়নি; বলা হয়েছে এমন এক আভ্যন্তরীণ বিপর্যয়ের কথা, যা দুনিয়াতেই শুরু হয়ে যায়-হৃদয় বন্ধ হয়ে যাওয়া, শ্রবণ নিষ্ফল হয়ে যাওয়া, দৃষ্টি থেকেও সত্য হারিয়ে যাওয়া। মানুষ বেঁচে থাকে, শুনে, দেখে, চলে, যুক্তি করে, তর্কও করে; অথচ তার অন্তরে আর সত্যের আলো প্রবেশ করে না। এর চেয়ে বড় বিপর্যয় আর কী হতে পারে?
এই আয়াত বুঝতে হলে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে-এটি হঠাৎ ঘটে না। আল্লাহ কাউকে প্রথম দিনেই সিলমোহর করে দেন না। মানুষই প্রথমে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, অবাধ্যতা বেছে নেয়, অহংকারে শক্ত হয়, উপদেশকে অবহেলা করে, নফসের দাবিকে প্রভু বানায়, পাপকে হালকা করে, তওবাকে পিছিয়ে দেয়। তারপর একসময় সেই ধারাবাহিক অস্বীকারই তার ভেতরে এমন অবস্থা তৈরি করে, যেখানে হেদায়াত আর তাকে স্পর্শ করে না। তখন আয়াতটি এসে চূড়ান্ত পরিণতি জানায়-এবার অন্তর মোহরকৃত।
“আল্লাহ তাদের অন্তরের উপর মোহর মেরে দিয়েছেন”-এই অংশের ভেতর গভীর কম্পন আছে। কারণ অন্তরই মানুষকে মানুষ বানায়। চোখ সত্য দেখে, কিন্তু বুঝে অন্তর। কান শব্দ শোনে, কিন্তু গ্রহণ করে অন্তর। যুক্তি চিন্তা করে, কিন্তু নত হয় অন্তর। সেই অন্তর যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে বাহ্যিক সব ইন্দ্রিয় অকার্যকর নয়, কিন্তু উদ্দেশ্যহীন হয়ে যায়। তখন মানুষ সত্য শোনে, কিন্তু তা তার ভেতরে নামে না। আয়াত পড়ে, কিন্তু কাঁপে না। মৃত্যু দেখে, কিন্তু ভাবে না। কবরের কথা শোনে, কিন্তু বদলায় না। জান্নাতের আশ্বাস শোনে, জাহান্নামের ভয় শোনে-তবু তার জীবন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।
এরপর বলা হলো-“তাদের শ্রবণশক্তির উপর।”
শোনা আর শোনার মধ্যে পার্থক্য আছে। অনেকেই কুরআন শোনে, নসিহত শোনে, সত্য শোনে, কিন্তু শুনেও শুনে না। কারণ শব্দ কানে আসে, কিন্তু হৃদয়ে নামে না। শ্রবণশক্তির উপর মোহর পড়ে গেলে উপদেশ বিরক্তিকর লাগে, সত্য কষ্টদায়ক লাগে, তাওবার ডাক বিলম্বের বিষয় মনে হয়। মানুষ তখন এমন অবস্থায় পৌঁছে যায়, যেখানে দুনিয়ার গল্পে তার মন নড়ে, কিন্তু আল্লাহর কথায় নড়ে না। এ এক ভয়াবহ আধ্যাত্মিক বধিরতা।
তারপর বলা হলো-“তাদের দৃষ্টির উপর রয়েছে আবরণ।”
এখানে আরেকটি সূক্ষ্মতা আছে। অন্তর ও শ্রবণের ক্ষেত্রে “মোহর”, কিন্তু দৃষ্টির ক্ষেত্রে “আবরণ”। কারণ মানুষ দুনিয়ার নিদর্শন চোখের সামনে দেখেই যাচ্ছে-রাত-দিন, জীবন-মৃত্যু, উত্থান-পতন, রোগ-সুস্থতা, অন্যায়ের পরিণতি, কবরের মিছিল, সময়ের ক্ষয়, বার্ধক্যের আগমন। কিন্তু তার দৃষ্টির উপর এমন পর্দা পড়ে যে, সে এসবের ভেতরে আল্লাহর নিদর্শন দেখে না। সে দেখে ঘটনা, দেখে তথ্য, দেখে পরিবর্তন-কিন্তু দেখে না শিক্ষা। সে দেখে জানাজা, কিন্তু দেখে না নিজের শেষ। সে দেখে কবর, কিন্তু দেখে না ফেরার পথ। সে দেখে দুনিয়ার অস্থায়িত্ব, কিন্তু তবু স্থায়িত্বের মতো আঁকড়ে ধরে থাকে।
দার্শনিকভাবে এই আয়াত মানুষের স্বাধীনতা ও পরিণতির এক কঠিন সত্য তুলে ধরে। মানুষ কেবল একটি সিদ্ধান্ত নেয় না; তার সিদ্ধান্তগুলো ধীরে ধীরে তাকে গড়ে তোলে। একটি পাপ, একটি অহংকার, একটি অবহেলা-এসব একা একা ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু এগুলো জমতে জমতে হৃদয়ের উপর স্তর পড়ে। তারপর সত্যের বিরুদ্ধে অভ্যাস তৈরি হয়। তারপর প্রতিরোধ জন্মায়। তারপর অসাড়তা আসে। তারপর মোহর। সুতরাং এই আয়াত শুধু আল্লাহর শাস্তির কথা না; এটি মানুষের আত্মবিধ্বংসী যাত্রার শেষ স্টেশন।
আধ্যাত্মিকভাবে এই আয়াত একজন মুমিনকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দেয় এই কারণে যে, হৃদয় বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো বাহ্যিক দৃশ্যমান রোগ না। মানুষ নামাজও পড়তে পারে, ধর্মীয় কথাও বলতে পারে, অন্যকে উপদেশও দিতে পারে-তবু ভেতরে ভেতরে তার হৃদয় কঠিন হয়ে যেতে পারে। সে কান্নার ভাষা ভুলে যেতে পারে। গুনাহের পর অনুতাপ কমে যেতে পারে। কুরআন পড়েও আগের মতো নাড়া না লাগতে পারে। দোয়া করতে গিয়ে মন জমাট লাগতে পারে। এগুলো খুব বড় সতর্কসংকেত। কারণ হৃদয়ের মৃত্যু সবসময় ঘোষণা দিয়ে আসে না; অনেক সময় তা আসে অনুভূতির ক্রমশ নিভে যাওয়া দিয়ে।
এই আয়াত তাই শুধু কাফিরদের বর্ণনা নয়; এটি মুমিনের জন্য আয়না। আমি কি এখনো সত্য শুনে অস্বস্তি পাই, নাকি নরম হই? আমি কি উপদেশ এড়িয়ে যাই? আমি কি পাপের পর আগের মতো কাঁদি? আমি কি কুরআন শুনে আর কাঁপি না? আমি কি মানুষকে দ্রুত বিচার করি, কিন্তু নিজেকে ছাড় দিয়ে যাই? আমি কি আল্লাহর নিদর্শন দেখি, কিন্তু থেমে চিন্তা করি না? এ প্রশ্নগুলো না করলে মানুষ বুঝতেই পারে না, কখন তার দৃষ্টির উপর পর্দা পড়ে গেছে।
“আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি”-এই অংশে এসে আয়াতটি চূড়ান্ত রূপ নেয়। অর্থাৎ অন্তর মোহরকৃত হওয়া নিজেই এক শাস্তি, আর এর পরিণতিতে আছে আরও বড় শাস্তি। দুনিয়ায় হৃদয়ের মৃত্যু, আখিরাতে জাহান্নামের যন্ত্রণা। তাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় ভয় হওয়া উচিত শুধু বাহ্যিক বিপদ না; অন্তরের বিপদ। কারণ যাকে আল্লাহ সম্পদ কম দিয়ে পরীক্ষা করেন, সে এখনো বাঁচতে পারে। যাকে মানুষ অবমূল্যায়ন করে, সে এখনো উত্তীর্ণ হতে পারে। কিন্তু যার হৃদয় সত্য গ্রহণের ক্ষমতা হারায়, তার অবস্থা সত্যিই ভয়ংকর।
এই আয়াতের এক অতি গভীর শিক্ষা হলো-সবচেয়ে বড় নিয়ামত শুধু চোখ থাকা না, সত্য দেখার চোখ থাকা। শুধু কান থাকা না, হক শোনার কান থাকা। শুধু হৃদয় থাকা না, আল্লাহর সামনে নরম হৃদয় থাকা। পৃথিবীতে জ্ঞানী অনেক, বাকপটু অনেক, বিশ্লেষক অনেক, বিতার্কিক অনেক-কিন্তু নরম হৃদয়ের মানুষ কম। আর আল্লাহর কাছে আসল মর্যাদা অনেক সময় তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কে না, জাগ্রত অন্তরে।
হে মানুষ,
সত্যকে অবহেলা কোরো না।
উপদেশকে খেলায় পরিণত কোরো না।
পাপকে ছোট ভাবতে ভাবতে হৃদয়কে অন্ধ কোরো না।
কারণ একসময় এমনও হতে পারে,
তুমি শুনবে, কিন্তু শুনবে না;
দেখবে, কিন্তু দেখবে না;
বাঁচবে, কিন্তু অন্তর মৃত হয়ে যাবে।
হে আল্লাহ,
আমার অন্তরকে সিলমোহরকৃত করবেন না।
আমার কানকে সত্যের প্রতি বধির করবেন না।
আমার চোখ থেকে হেদায়াতের আলো সরিয়ে নেবেন না।
আমাকে এমন মানুষ বানান,
যে আয়াত শুনে নরম হয়,
নসিহত শুনে ফিরে আসে,
পাপের পর লজ্জা পায়,
আর আপনার নিদর্শন দেখে জেগে ওঠে।
মানুষের সবচেয়ে বড় বিপদ বাইরে না,
ভেতরে।
সবচেয়ে ভয়াবহ জাহান্নাম কখনো কখনো শুরু হয়
একটি বন্ধ হৃদয় থেকে।
এ আয়াত পড়ে ভয় পায়,
নিজেকে যাচাই করে,
আল্লাহর কাছে নরম অন্তর ভিক্ষা চায়-
সে এখনো আশাহীন নয়।
কারণ ভয়ই মাঝে মাঝে ঈমানের শেষ জীবন্ত স্পন্দন।
আর যে হৃদয় নিজের কঠিন হয়ে যাওয়াকে ভয় পায়,
আল্লাহর রহমতে সেই হৃদয়ের জন্য
ফিরে আসার দরজা এখনো বন্ধ হয়নি।