এই আয়াতটি আগের কয়েকটি আয়াতের এক মহিমান্বিত উপসংহার। সেখানে মুত্তাকীদের বৈশিষ্ট্য বলা হলো-তারা গায়েবের প্রতি ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে, আল্লাহপ্রদত্ত রিযিক থেকে ব্যয় করে, কুরআন ও পূর্ববর্তী ওহীর প্রতি ঈমান আনে, আর আখিরাতে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে। এখন এই আয়াতে আল্লাহ যেন সিলমোহর দিয়ে দিচ্ছেন-এইসব মানুষই সত্যিই পথের উপর আছে, আর এই মানুষগুলোর পরিণতিই সফলতা।

খেয়াল করলে দেখা যায়, আল্লাহ বলেননি-তারা পথ খুঁজছে; বলেছেন-“তারা সঠিক পথের উপর রয়েছে।” এর মধ্যে গভীর আধ্যাত্মিক আশ্বাস আছে। কারণ একজন মুমিনের জীবন কেবল অনুসন্ধানের নাম নয়; আল্লাহর অনুগ্রহে একসময় সে এমন অবস্থায় পৌঁছে, যেখানে সে শুধু পথের সন্ধানী নয়, পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত মানুষ। অবশ্য এর মানে এই নয় যে সে ভুল করবে না বা হোঁচট খাবে না। বরং এর মানে হলো-তার দিক সঠিক, তার অভিমুখ সঠিক, তার অন্তরের কম্পাস সোজা আছে। সে যদি পড়ে যায়ও, সে ভুল দিকের মানুষ নয়; তার ফিরে আসার রাস্তা আছে।

“তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে”-এই অংশটি খুব গভীর। পথ পাওয়া মানুষ নিজের যোগ্যতায় পথ পায় না, নিজের বুদ্ধির অহংকারে পথ পায় না। সে হেদায়াত পায় “রবের পক্ষ থেকে”। অর্থাৎ হেদায়াত অর্জনযোগ্য কৃতিত্ব নয় শুধু; এটি প্রাপ্ত অনুগ্রহও। এই উপলব্ধি মুমিনকে বিনয়ী করে। কারণ সে জানে, আমি অন্যদের চেয়ে বুদ্ধিমান বলে সোজা নই; বরং আমার রব দয়া করেছেন বলেই আমি আজও পথ চিনতে পারছি। এ বোধ মানুষকে অন্যকে তুচ্ছ করতে দেয় না, আবার নিজের হেদায়াত নিয়েও আত্মগর্বী হতে দেয় না।

দার্শনিকভাবে এই আয়াত মানুষের “সফলতা” ধারণাটাকেও নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। দুনিয়ার মানুষ সফলতা বলতে বোঝে-সম্পদ, প্রভাব, খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা, নিয়ন্ত্রণ, বাহ্যিক অর্জন। কিন্তু কুরআন এখানে বলে-সফল সেই, যে হেদায়াতের উপর আছে। অর্থাৎ সঠিক পথে থাকা-ই প্রকৃত সফলতার ভিত্তি। কারণ মানুষ সবকিছু পেতে পারে, কিন্তু যদি পথ হারায়, তবে তার প্রাপ্তি তাকে রক্ষা করতে পারবে না। আবার মানুষ অনেক কিছু না-ও পেতে পারে, কিন্তু যদি হেদায়াতের উপর থাকে, তবে সে আসলে ক্ষতিগ্রস্ত নয়।

এই আয়াত আমাদের শেখায়-সফলতা শুরু হয় অন্তর থেকে, ব্যাংক ব্যালেন্স থেকে না; তা শুরু হয় দিকনির্দেশনা থেকে, প্রদর্শনী থেকে না; তা শুরু হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে চলা থেকে, মানুষের করতালির দিকে ছোটা থেকে না।

“আর তারাই সফলকাম”-এই অংশে আরবি “মুফলিহূন” শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু পাস করা বা কোনোভাবে টিকে যাওয়ার ভাব নেই; এর মধ্যে আছে প্রকৃত সাফল্য, মুক্তি, কল্যাণ, অর্জন, নিরাপদ পরিণতি। যেন বলা হচ্ছে-জীবনের আসল বিজয়ী তারা, যারা ঈমান, ইবাদত, ব্যয়, ওহীর প্রতি আনুগত্য, এবং আখিরাতের ইয়াকীনের পথে অবিচল থাকে। তারা হয়তো দুনিয়ার চোখে সবসময় বড় নাও হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর দরবারে তারাই আসল বিজয়ী।

আধ্যাত্মিকভাবে এই আয়াত এক ক্লান্ত মুমিনের জন্য বিরাট সান্ত্বনা। কারণ অনেক সময় সোজা পথে হাঁটা মানুষকে দুনিয়ায় দুর্বল মনে হয়। যারা হারাম এড়িয়ে চলে, চোখ-হৃদয় সংযত রাখে, সত্যের সাথে আপস করে না, সালাতে ফিরে আসে, কুরআনের সামনে মাথা নত করে-তারা অনেক সময় বাহ্যিক দৌড়ে পিছিয়ে পড়েছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু কুরআন এসে ঘোষণা দেয়-না, প্রকৃত পরাজিত তারা নয়। তারা রবের পক্ষ থেকে হেদায়াতের উপর আছে, আর তারাই সফলকাম।

কী বিস্ময়কর উল্টে দেওয়া!
দুনিয়া যাকে “পিছিয়ে পড়া” ভাবে, কুরআন তাকে “সফল” বলতে পারে।
দুনিয়া যাকে “স্মার্ট” ভাবে, কুরআন তাকে পথহারা বলতেও পারে।
এখানে মানদণ্ড বদলে যায়।
এখানে সাফল্য মানে শুধু এগিয়ে যাওয়া না; সঠিক দিকে এগিয়ে যাওয়া।
এখানে প্রাপ্তি মানে শুধু অনেক পাওয়া না; এমন পাওয়া, যা আখিরাতে টিকে থাকবে।

এই আয়াত আরও একটি সূক্ষ্ম শিক্ষা দেয়-হেদায়াত ও সফলতা আলাদা জিনিস নয়। অনেকেই সফল হতে চায়, কিন্তু হেদায়াতকে গুরুত্ব দেয় না। অনেকেই জান্নাত চায়, কিন্তু কুরআনের মানদণ্ডে জীবন গড়তে চায় না। অথচ আল্লাহ এখানে দেখিয়ে দিচ্ছেন, সফলতা হেদায়াতের ফল। যে সঠিক পথে থাকে, তার পরিণতিই সফলতা। আর যে পথ হারায়, তার বাহ্যিক জৌলুশ শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচাতে পারে না।

ঈমান জাগানিয়া দিক থেকে এই আয়াত আমাদের সামনে এক কঠিন কিন্তু মধুর প্রশ্ন তোলে:

আমি কি সত্যিই সঠিক পথের উপর আছি, নাকি শুধু নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছি?
আমার সফলতার ধারণা কি আল্লাহর দেওয়া মানদণ্ডে তৈরি, নাকি মানুষের হাততালিতে?
আমি কি হেদায়াতকে আল্লাহর অনুগ্রহ মনে করি, নাকি নিজের ধার্মিকতা নিয়ে ভেতরে ভেতরে গর্ব করি?
আমি কি এমন জীবনের দিকে যাচ্ছি, যার শেষ আল্লাহ বলবেন-এটাই সফলতা?

যে মানুষ এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করে, তার ভেতরে দুটি জিনিস জন্ম নেয়-কৃতজ্ঞতা ও সতর্কতা।

কৃতজ্ঞতা-যদি আল্লাহ তাকে ঈমান, সালাত, কুরআনের প্রতি ভালোবাসা, আখিরাতের বোধ দিয়ে থাকেন।
সতর্কতা-কারণ এ পথের উপর টিকে থাকাও আল্লাহর রহমতেরই বিষয়; অসতর্ক হলে মানুষ পথ হারাতেও পারে।

এই আয়াতের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো-এটি একজন মুমিনকে ভেতর থেকে সম্মান দেয়। সে যদি পৃথিবীর চোখে ছোটও হয়, তবু সে জানে, হেদায়াতের উপর থাকা মানুষ কখনো তুচ্ছ নয়। কারণ তার দিক ঠিক, তার রব আছেন, তার পথ আলোকিত, আর তার গন্তব্য অর্থহীন নয়।

সুরা বাকারার ৫নং আয়াত তাই শুধু মুত্তাকীদের প্রশংসা না; এটি আমাদের সকলের জন্য লক্ষ্যনির্ধারণও।

সত্যিকারের সফলতা হলো-
গায়েবে ঈমান রাখা,
সালাত কায়েম করা,
রিযিক থেকে ব্যয় করা,
ওহীর সামনে নত হওয়া,
আখিরাতে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা,
এবং এই সবকিছুর উপর স্থির থাকা।
যে মানুষ এভাবে বাঁচে,
সে হয়তো শোরগোলের মানুষ না,
কিন্তু সে নূরের মানুষ।
সে হয়তো প্রচারের মানুষ না,
কিন্তু সে রবের দিকে চলমান মানুষ।
সে হয়তো দুনিয়ার চোখে অসম্পূর্ণ,
কিন্তু আল্লাহর মানদণ্ডে সে পথে আছে।
আর এটাই আসল কথা-
পথে থাকা মানুষই একদিন পৌঁছে যায়।
আর আল্লাহ যাদের সম্পর্কে বলেন, “তারাই সফলকাম”-
তাদের চেয়ে বড় বিজয়ী আর কে?