এই আয়াত আগের আয়াতের ধারাবাহিকতা। আগের আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, যখন মানুষকে বলা হয়—আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার অনুসরণ করো, তখন তারা বলে—আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের পথই অনুসরণ করব। অথচ তাদের পিতৃপুরুষরা যদি বুঝে না থাকে, হেদায়েতপ্রাপ্ত না হয়ে থাকে, তবুও কি তাদের অন্ধভাবে অনুসরণ করা হবে? এই আয়াতে সেই অন্ধ অনুসরণের একটি গভীর উপমা দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ বলেন, যারা কুফরি করেছে, তাদের অবস্থা এমন এক পশুর মতো, যাকে রাখাল ডাকছে; কিন্তু সে ডাকের অর্থ বোঝে না। সে শুধু শব্দ শুনে—চিৎকার, আওয়াজ, ধ্বনি। কিন্তু সেই ধ্বনির ভেতরে যে অর্থ, সতর্কতা, নির্দেশনা, কল্যাণ—তা তার বোধে পৌঁছে না। অর্থাৎ সত্যের আহ্বান তাদের কানে পৌঁছায়, কিন্তু হৃদয়ে নামে না। আয়াত তারা শুনে, কিন্তু উপলব্ধি করে না। দাওয়াত তাদের সামনে আসে, কিন্তু তারা তার অর্থ গ্রহণ করে না।
এই উপমা অত্যন্ত গভীর। মানুষের কাছে কান আছে, কিন্তু সত্য শুনতে হলে শুধু কান যথেষ্ট নয়; দরকার অন্তরের জাগরণ। চোখ আছে, কিন্তু হেদায়েত দেখতে হলে শুধু দৃষ্টি যথেষ্ট নয়; দরকার বিনয়। জিহ্বা আছে, কিন্তু সত্য স্বীকার করতে হলে শুধু ভাষা যথেষ্ট নয়; দরকার আত্মসমর্পণ। তাই আল্লাহ বলেছেন—তারা বধির, বোবা ও অন্ধ। অর্থাৎ শারীরিকভাবে নয়; আধ্যাত্মিকভাবে। তাদের কান সত্যের অর্থ গ্রহণ করে না, জিহ্বা সত্য স্বীকার করে না, চোখ সত্যের নিদর্শন দেখে না।
মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর ক্ষতি হলো—সে শুনতে পায়, কিন্তু বুঝতে চায় না। কুরআনের আয়াত তার কানে আসে, আযানের ধ্বনি তার চারপাশে বাজে, মৃত্যু তার চোখের সামনে ঘটে, জীবনের অনিশ্চয়তা তাকে বারবার নাড়া দেয়; তবুও তার ভিতর বদলায় না। সে শব্দ পায়, কিন্তু বার্তা পায় না। সে ঘটনা দেখে, কিন্তু শিক্ষা নেয় না। সে উপদেশ শোনে, কিন্তু নিজের জীবনে নামায় না।
এই আয়াত আমাদের শেখায়—হেদায়েত শুধু তথ্যের ব্যাপার নয়; হেদায়েত হলো হৃদয়ের সাড়া। যে হৃদয় অহংকারে, অন্ধ অনুসরণে, নফসের দাসত্বে বা পূর্বপুরুষের ভুল গৌরবে ঢেকে যায়, তার কাছে সত্যের আওয়াজ শুধু শব্দ হয়ে থাকে। কুরআন তার কাছে আলো নয়, শুধু পাঠ। আযান তার কাছে ডাক নয়, শুধু শব্দ। মৃত্যু তার কাছে সতর্কতা নয়, শুধু ঘটনা।
অন্ধ অনুসরণের মানুষ সত্যকে যাচাই করে না। সে শোনে—কিন্তু বোঝার জন্য নয়; নিজের পুরনো অবস্থান রক্ষা করার জন্য। সে দেখে—কিন্তু শিক্ষা নেওয়ার জন্য নয়; নিজের ধারণাকে শক্ত করার জন্য। সে কথা বলে—কিন্তু সত্য স্বীকারের জন্য নয়; অজুহাত বানানোর জন্য। তাই তার কানে দাওয়াত পৌঁছালেও, হৃদয়ে হেদায়েত পৌঁছায় না।
“তারা বধির”—কারণ তারা আল্লাহর আয়াতের আহ্বান শুনেও হৃদয়ে গ্রহণ করে না।
“তারা বোবা”—কারণ সত্য স্পষ্ট হলেও তারা তা স্বীকার করে না।
“তারা অন্ধ”—কারণ নিদর্শন সামনে থাকলেও তারা আল্লাহর পথে আলো দেখে না।
এটি শরীরের অক্ষমতা নয়; এটি আত্মার অক্ষমতা। আর আত্মার অক্ষমতা অনেক বেশি ভয়ংকর। কারণ শরীরের অন্ধ মানুষ আল্লাহর কাছে সম্মানিত হতে পারে, যদি তার হৃদয় আলোকিত হয়। কিন্তু চোখ থাকা সত্ত্বেও যে হৃদয় সত্য থেকে অন্ধ, সে সবচেয়ে বড় বঞ্চিত।
এই আয়াত আমাদের নিজেদের ভেতরেও তাকাতে বাধ্য করে। আমরা কি কুরআন শুনি শুধু শব্দ হিসেবে, নাকি নিজের জীবনের উপর নাজিল হওয়া নির্দেশ হিসেবে? আমরা কি আযান শুনি শুধু পরিচিত আওয়াজ হিসেবে, নাকি আল্লাহর দরবারে ডাকা হিসেবে? আমরা কি উপদেশ শুনে অন্যের কথা ভাবি, নাকি নিজের হৃদয়কে বিচার করি? আমরা কি সত্য সামনে এলেও বলি—আমাদের পরিবারে, সমাজে, দলে তো এমনই চলে আসছে?
যদি সত্য শোনার পরও আমাদের জীবন না বদলায়, তবে ভয় করা দরকার। কারণ কুরআনের শব্দ কানে এসে থেমে যাওয়ার জন্য নয়; হৃদয়ে প্রবেশ করার জন্য। আযান শুধু বাতাসে ভেসে যাওয়ার জন্য নয়; বান্দাকে সিজদায় নামানোর জন্য। মৃত্যু শুধু সংবাদ হওয়ার জন্য নয়; আত্মাকে জাগানোর জন্য।
এই আয়াত মানুষের বুদ্ধিকে জাগিয়ে তোলে। আল্লাহ শেষে বলেন—“তারা বুঝে না।” অর্থাৎ আসল সমস্যা বোধের মৃত্যু। মানুষ যখন নিজের নফস, অভ্যাস, সমাজ, পূর্বপুরুষের অন্ধ পথ, অথবা দুনিয়ার মোহকে সত্যের উপর বসিয়ে দেয়, তখন তার বুঝ মলিন হয়ে যায়। সে তখন নিজের ক্ষতিকেও লাভ মনে করে, অন্ধকারকেও নিরাপত্তা মনে করে, গাফিলতাকেও স্বাভাবিক মনে করে।
মুমিনের পথ এর বিপরীত। মুমিন শুনলে ভাবতে শেখে। আয়াত শুনলে নিজের জীবন পরীক্ষা করে। আযান শুনলে সাড়া দেয়। মৃত্যু দেখলে আখিরাত স্মরণ করে। ভুল বুঝলে ফিরে আসে। সে পূর্বপুরুষকে সম্মান করে, কিন্তু সত্যের উপর তাদের ভুলকে বসায় না। সে সমাজে থাকে, কিন্তু সমাজকে রব বানায় না। সে মানুষের কথা শোনে, কিন্তু চূড়ান্ত আনুগত্য রাখে আল্লাহর নাজিল করা হেদায়েতের প্রতি।
এই আয়াত আমাদের শেখায়—শুধু কানে শুনলেই মানুষ শ্রোতা হয় না; হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করাই আসল শ্রবণ। শুধু চোখে দেখলেই মানুষ দর্শক হয় না; নিদর্শন থেকে শিক্ষা নেওয়াই আসল দেখা। শুধু মুখে কথা বললেই মানুষ সত্যবাদী হয় না; সত্যকে স্বীকার করাই আসল ভাষা।
আজকের পৃথিবীতে শব্দের অভাব নেই। উপদেশ আছে, আলোচনা আছে, বক্তৃতা আছে, লেখা আছে, ভিডিও আছে, কুরআন তিলাওয়াত আছে—কিন্তু হৃদয়ের জাগরণ কতটুকু? আমরা অনেক শুনি, কিন্তু কতটা বদলাই? অনেক জানি, কিন্তু কতটা মানি? অনেক বলি, কিন্তু কতটা আত্মসমর্পণ করি? এই আয়াত আমাদের এই ভয়ংকর ফাঁকটি দেখিয়ে দেয়—শব্দ ও হেদায়েত এক নয়, যদি হৃদয় বন্ধ থাকে।
তাই আমাদের সবচেয়ে বড় দোয়া হওয়া উচিত—হে আল্লাহ, আমাদের কানকে সত্য গ্রহণকারী কান বানান; চোখকে নিদর্শন দেখা চোখ বানান; জিহ্বাকে সত্য স্বীকারকারী জিহ্বা বানান; হৃদয়কে বোঝার হৃদয় বানান। আমাদের এমন মানুষ করবেন না, যারা আয়াত শুনেও শুধু শব্দ শোনে, আযান শুনেও শুধু আওয়াজ শোনে, মৃত্যু দেখেও শুধু ঘটনা দেখে।
কারণ হেদায়েতের শুরু হয় যখন মানুষ সত্যকে শুধু শোনে না—নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করে। যখন আয়াত শুনে সে বলে, এটি অন্য কারও জন্য নয়; এটি আমার জন্য। যখন আযান শুনে সে বোঝে, আমাকে ডাকা হচ্ছে। যখন কুরআন পড়ে সে নিজের অন্ধকার চিনতে পারে। তখনই হৃদয় জীবিত হয়।
হে আল্লাহ, আমাদের আধ্যাত্মিক বধিরতা, বোবাভাব ও অন্ধত্ব থেকে রক্ষা করুন। আমাদের কুরআনের শব্দে অর্থ, অর্থে হেদায়েত, হেদায়েতে আত্মসমর্পণ দান করুন। আমাদের এমন বান্দা বানান, যারা সত্য শুনে সাড়া দেয়, নিদর্শন দেখে শিক্ষা নেয়, ভুল বুঝে ফিরে আসে, এবং অন্ধ অনুসরণের বদলে আপনার নাজিল করা হেদায়েতকে জীবনের আলো বানায়।