এই আয়াতে আল্লাহ আমাদের সামনে নবীদের এক গভীর পারিবারিক দৃশ্য তুলে ধরেছেন। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তাঁর সন্তানদের উপদেশ দিচ্ছেন, ইয়াকুব আলাইহিস সালামও তাঁর সন্তানদের একই উপদেশ দিচ্ছেন। এটি শুধু পিতা-পুত্রের সাধারণ কথোপকথন নয়; এটি নবীদের উত্তরাধিকার। এখানে সম্পদের অসিয়ত নেই, ক্ষমতার অসিয়ত নেই, জমি-জমার হিসাব নেই, বংশের গৌরব নেই—এখানে আছে দ্বীনের অসিয়ত, ঈমানের অসিয়ত, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পিত থাকার অসিয়ত।
ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জীবন ছিল আত্মসমর্পণের জীবন। আগের আয়াতে তিনি বলেছিলেন, “আমি সমগ্র জগতের রবের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।” আর এই আয়াতে তিনি সেই আত্মসমর্পণের শিক্ষা সন্তানদের হৃদয়ে স্থাপন করে যাচ্ছেন। কারণ একজন মুমিন পিতার কাছে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা সন্তানের দুনিয়াবি সফলতা নয়; সন্তানের ঈমান। সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার অর্থ নয়; তাওহীদ। সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঘর নয়; আল্লাহর কাছে মুসলিম অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সৌভাগ্য।
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য এই দ্বীনকে মনোনীত করেছেন”—এই বাক্যটি কত বড় অনুগ্রহের ঘোষণা! ইসলাম কোনো মানুষের বানানো পথ নয়, কোনো জাতিগত সংস্কার নয়, কোনো সামাজিক প্রথা নয়। এটি আল্লাহর মনোনীত দ্বীন। অর্থাৎ মানুষ নিজের জন্য পথ বানাতে পারে, দর্শন বানাতে পারে, সভ্যতার নীতি বানাতে পারে; কিন্তু স্রষ্টা যে পথ মনোনীত করেন, সেটিই মানুষের প্রকৃত মুক্তির পথ। যে রব মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই জানেন কোন পথ তার আত্মাকে বাঁচাবে, কোন বিধান তার জীবনকে পবিত্র করবে, কোন বিশ্বাস তাকে আখিরাতে নিরাপদ করবে।
এখানেই ইসলামের মহিমা—এটি মানুষের পছন্দের ধর্ম নয়; এটি আল্লাহর নির্বাচিত জীবনপথ। মানুষ যদি নিজের নফসকে অনুসরণ করে, সে পথ হারায়। সমাজকে অনুসরণ করলে সমাজ বদলায়। যুগকে অনুসরণ করলে যুগ পাল্টায়। কিন্তু আল্লাহর মনোনীত দ্বীন অপরিবর্তনীয় সত্যের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। এই দ্বীন মানুষকে শুধু নামাজ শেখায় না, তাকে জীবন শেখায়; শুধু হালাল-হারাম শেখায় না, তাকে আত্মার মর্যাদা শেখায়; শুধু আচার শেখায় না, তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি শেখায়।
এরপর আসে আয়াতের হৃদয়কাঁপানো নির্দেশ—“তোমরা মুসলিম অবস্থায় ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না।”
মানুষ মৃত্যুর সময় বেছে নিতে পারে না, মৃত্যুর স্থান বেছে নিতে পারে না, মৃত্যুর পরিস্থিতি বেছে নিতে পারে না। কিন্তু মানুষ জীবনে এমনভাবে চলতে পারে, যাতে মৃত্যু যখন আসে, সে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পিত অবস্থায় থাকে। এই বাক্যের গভীর অর্থ হলো—জীবনকে এমনভাবে গড়ো, যেন মৃত্যু তোমাকে ইসলামের বাইরে না পায়। প্রতিটি দিন, প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি আয়, প্রতিটি কথা, প্রতিটি গোপন কাজ—সবকিছু এমনভাবে সাজাও, যেন শেষ নিঃশ্বাসের সময় তোমার হৃদয় আল্লাহর দিকে থাকে।
মৃত্যু হঠাৎ আসে। কেউ প্রস্তুতির ঘোষণা পায় না। কেউ নিশ্চিত জানে না, কোন নামাজ তার শেষ নামাজ, কোন রমজান তার শেষ রমজান, কোন সিজদা তার শেষ সিজদা, কোন রাত তার শেষ রাত, কোন সকাল তার শেষ সকাল। তাই মুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার অসিয়ত আসলে মুসলিম অবস্থায় বেঁচে থাকার অসিয়ত। কারণ যে যেমন বাঁচে, সাধারণত সে তেমন অবস্থাতেই মৃত্যুর দিকে এগোয়। জীবন যদি আল্লাহ থেকে দূরে কাটে, শেষ মুহূর্তের নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া ভয়ংকর আত্মপ্রবঞ্চনা।
এই আয়াত আমাদের পারিবারিক জীবনের ধারণাকেও বদলে দেয়। আমরা সন্তানদের বলি—ভালো করে পড়ো, প্রতিষ্ঠিত হও, মানুষের মতো মানুষ হও, আয় করো, সম্মান অর্জন করো। এসব প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু নবীদের ভাষায় সন্তানের প্রতি সবচেয়ে বড় কথা হলো—আল্লাহর দ্বীনের উপর অটল থাকো, মুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করো। কারণ সন্তান যদি দুনিয়া পায় কিন্তু আল্লাহকে হারায়, তবে সে কী পেল? সন্তান যদি ক্যারিয়ার পায় কিন্তু সিজদা হারায়, তবে সে কতটা সফল? সন্তান যদি মানুষের চোখে বড় হয় কিন্তু আখিরাতে নিঃস্ব দাঁড়ায়, তবে পিতামাতার কোন স্বপ্ন পূর্ণ হলো?
ইবরাহিম ও ইয়াকুব আলাইহিমাস সালামের অসিয়ত আমাদের শেখায়—ঘরের ভেতরে ঈমানের আলোচনা জীবিত রাখতে হয়। সন্তানকে শুধু খাবার, পোশাক, শিক্ষা ও নিরাপত্তা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাকে আল্লাহর পরিচয় দিতে হয়, আখিরাতের কথা শেখাতে হয়, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হয়, সিজদার স্বাদ শেখাতে হয়, হালাল-হারামের মর্যাদা বুঝাতে হয়, মৃত্যুর কথা মনে করাতে হয়। যে ঘরে ঈমানের অসিয়ত নেই, সে ঘর বাহ্যিকভাবে সুন্দর হলেও ভিতরে আধ্যাত্মিকভাবে দরিদ্র।
এই আয়াতের ভেতরে আরও একটি গভীর সত্য আছে—হেদায়েত বংশগত সম্পত্তি নয়, কিন্তু দ্বীনের অসিয়ত প্রজন্মের দায়িত্ব। নবীর সন্তান হলেই কেউ নিরাপদ নয়; মুসলিম পরিবারে জন্মালেই কেউ জান্নাতের নিশ্চয়তা পায় না। তাই নবীরা সন্তানদের সতর্ক করেছেন। তাঁরা জানতেন, ঈমানের পথকে প্রতিদিন বেছে নিতে হয়। আল্লাহর দ্বীনকে শুধু উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া যথেষ্ট নয়; হৃদয়ের সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে হয়।
আমাদের সময়ের এক বড় বিপদ হলো—আমরা ইসলামকে পরিচয় হিসেবে রাখি, কিন্তু জীবনপথ হিসেবে কতটা গ্রহণ করি? মুসলিম নাম, মুসলিম পরিবার, মুসলিম সমাজ—এসব আছে; কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্তে ইসলাম কতটা আছে? আমাদের ব্যবসায়, রাগে, ভালোবাসায়, আনন্দে, শোকে, রাজনীতিতে, শিক্ষায়, সন্তানের স্বপ্নে, মৃত্যুর প্রস্তুতিতে—ইসলাম কতটা শাসন করে? এই আয়াত আমাদের বলে—আল্লাহ যে দ্বীন মনোনীত করেছেন, তাকে জীবনের প্রান্তে নয়, কেন্দ্রে রাখো।
“মুসলিম অবস্থায় ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না”—এই বাক্য আমাদের আত্মাকে কাঁপিয়ে দেয়, কারণ মৃত্যুর মুহূর্ত মানুষের জীবনের সারাংশকে প্রকাশ করে। শেষ নিঃশ্বাসে মুখে কী আসবে, হৃদয় কোথায় থাকবে, চোখ কী নিয়ে বন্ধ হবে—এসব হঠাৎ তৈরি হয় না; দীর্ঘ জীবনের অভ্যাস সেখানে সাক্ষ্য দেয়। যে হৃদয় আল্লাহর স্মরণে অভ্যস্ত, সে মৃত্যুর সময় আল্লাহর দিকেই ঝুঁকে পড়ে। আর যে হৃদয় দুনিয়ার মোহে ডুবে থাকে, শেষ মুহূর্তে তার জন্য দুনিয়া ছাড়াও কঠিন হয়ে যায়।
তাই এই আয়াত শুধু সন্তানদের জন্য পিতার অসিয়ত নয়; এটি আমাদের নিজের আত্মার প্রতিও অসিয়ত। নিজের হৃদয়কে বলো—হে আমার আত্মা, আল্লাহ তোমার জন্য এই দ্বীন মনোনীত করেছেন; তুমি দুনিয়ার মোহে পড়ে তা হারিয়ে ফেলো না। হে আমার নফস, তুমি অস্থায়ী স্বাদের জন্য চিরস্থায়ী পথ থেকে সরে যেও না। হে আমার জীবন, তুমি এমনভাবে চল, যেন মৃত্যু এলে তুমি লজ্জিত না হও।
ইসলামকে আঁকড়ে থাকা মানে শুধু বাহ্যিক পরিচয় ধরে রাখা নয়; এটি হৃদয়ের আনুগত্য, শরীরের ইবাদত, জিহ্বার সত্য, চোখের পবিত্রতা, রিজিকের হালালতা, সম্পর্কের ন্যায়, গোপন জীবনের তাকওয়া। মানুষ বাইরে থেকে মুসলিম দেখাতে পারে, কিন্তু মুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার জন্য ভিতরকেও মুসলিম হতে হয়। অন্তরের অহংকার, লোভ, হিংসা, রিয়া, হারামের প্রতি আসক্তি—এসবকে আল্লাহর সামনে সমর্পণ করতে হয়।
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মৃত্যু আসার আগে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো নিজের ঈমান পরীক্ষা করা। আমি কি আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট? আমি কি তাঁর বিধানের সামনে নত? আমি কি হারামকে হারাম মানি, যদিও নফস তা পছন্দ করে? আমি কি সত্যকে সত্য মানি, যদিও সমাজ তা অপছন্দ করে? আমি কি তাওবা করি, না গুনাহকে স্বাভাবিক বানিয়ে ফেলেছি? আমি কি আল্লাহর দিকে ফিরছি, না শুধু সময় কাটাচ্ছি?
নবীদের অসিয়ত কখনও পুরোনো হয় না। ইবরাহিম ও ইয়াকুব আলাইহিমাস সালামের সেই ডাক আজও প্রতিটি ঘরে শোনা উচিত—হে সন্তানরা, হে পরিবার, হে প্রজন্ম, আল্লাহ তোমাদের জন্য দ্বীন মনোনীত করেছেন; দুনিয়ার ঝড়, সমাজের মোহ, ফিতনার আলো, মানুষের চাপ, নফসের ডাক—কিছুতেই এই দ্বীন ছেড়ে যেও না। মৃত্যুর মুহূর্তে তোমাদের পরিচয় যেন একটাই থাকে—তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পিত বান্দা।
আজ আমাদের প্রতিটি ঘরে এই আয়াতের ভাষা ফিরে আসা দরকার। বাবা সন্তানের কাছে, মা সন্তানের কাছে, শিক্ষক ছাত্রের কাছে, প্রবীণ নতুন প্রজন্মের কাছে—সবাই যেন শুধু দুনিয়ার সাফল্যের ভাষা নয়, আখিরাতের নিরাপত্তার ভাষাও রেখে যায়। কারণ সন্তান যদি আল্লাহর পথে থাকে, সে দুনিয়ায় কষ্ট পেলেও আলোতে আছে। আর সন্তান যদি আল্লাহ থেকে দূরে যায়, সে দুনিয়ায় সফল দেখালেও ভিতরে হারানোর পথে।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে হৃদয় নিজেকে প্রশ্ন করুক—আমি কী রেখে যেতে চাই? ব্যাংক ব্যালেন্স, বাড়ি, জমি, নাম, স্মৃতি—নাকি এমন ঈমানি উত্তরাধিকার, যা আমার মৃত্যুর পরও সন্তানদের সিজদায়, দোয়ায়, চরিত্রে, হালাল জীবনে বেঁচে থাকবে? নবীদের উত্তরাধিকার ছিল ঈমান। মুমিনের উত্তরাধিকারও ঈমানই হওয়া উচিত।
সবশেষে এই আয়াত আমাদের সবচেয়ে বড় প্রস্তুতির দিকে ফিরিয়ে আনে—শেষ নিঃশ্বাসের প্রস্তুতি। মানুষ অনেক কিছুর জন্য প্রস্তুতি নেয়—পরীক্ষা, চাকরি, ব্যবসা, বিয়ে, ভ্রমণ, ঘর, ভবিষ্যৎ। কিন্তু যে মৃত্যুর জন্য কোনো তারিখ জানা নেই, তার প্রস্তুতি সবচেয়ে বেশি জরুরি। আর সেই প্রস্তুতির সারাংশ একটাই—মুসলিম হয়ে বাঁচা, মুসলিম হয়ে মারা যাওয়া।
হে আল্লাহ, আমাদের আপনার মনোনীত দ্বীনের উপর অটল রাখুন। আমাদের সন্তান, পরিবার ও প্রজন্মকে ইসলামের আলোয় দৃঢ় করুন। আমাদের জীবনকে এমন আত্মসমর্পণে ভরিয়ে দিন, যাতে মৃত্যু যখনই আসে, আমাদের হৃদয় আপনার দিকেই থাকে। আমাদের শেষ কথা, শেষ দৃষ্টি, শেষ নিঃশ্বাস, শেষ অবস্থা—সবকিছু যেন আপনার কাছে আত্মসমর্পিত মুসলিম বান্দার মতো হয়।