এই আয়াতে আমরা দেখি, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম কাবা ঘর নির্মাণের ধারাবাহিকতায় মক্কার জন্য দোয়া করছেন। তিনি আল্লাহর কাছে প্রথমে নিরাপত্তা চেয়েছেন, তারপর রিজিক চেয়েছেন। কারণ নিরাপত্তা ছাড়া রিজিকের স্বাদ পূর্ণ হয় না; ভয়গ্রস্ত হৃদয়ে ফলমূল থাকলেও শান্তি থাকে না। আর রিজিক ছাড়া জীবন কঠিন হয়ে যায়। তাই একজন নবীর দোয়ায় সমাজজীবনের দুই মৌলিক প্রয়োজন একসঙ্গে এসেছে—নিরাপত্তা ও জীবিকা।

কিন্তু এই দোয়ার ভাষা অত্যন্ত গভীর। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম রিজিকের দোয়া করেছেন বিশেষ করে তাদের জন্য, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনে। যেন তাঁর হৃদয়ের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা ছিল—আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ যেন ঈমানদারদের জন্য হয়, পবিত্র নগর যেন পবিত্র বিশ্বাসের মানুষের আশ্রয় হয়। কিন্তু আল্লাহ তাঁর জবাবে একটি বিশাল সত্য জানিয়ে দিলেন—দুনিয়ার রিজিক শুধু মুমিনদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। যে কুফরি করবে, তাকেও আল্লাহ কিছু সময়ের জন্য ভোগের সুযোগ দেবেন।

এখানেই দুনিয়ার রহস্য। দুনিয়া পুরস্কারের চূড়ান্ত জায়গা নয়; দুনিয়া পরীক্ষা। তাই এখানে মুমিনও রিজিক পায়, কাফিরও রিজিক পায়। সৎ মানুষও খায়, অসৎ মানুষও খায়। আল্লাহর প্রিয় বান্দাও অসুস্থ হয়, অবাধ্য মানুষও বিলাসে থাকে। কেউ সম্পদ পেয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়, কেউ সম্পদ পেয়ে আল্লাহকে ভুলে যায়। তাই দুনিয়ার প্রাচুর্য দেখে কাউকে আল্লাহর প্রিয় ভাবা যায় না; আর দুনিয়ার সংকট দেখে কাউকে আল্লাহর কাছে অপমানিত ভাবা যায় না। আসল ফয়সালা দুনিয়ার টেবিলে নয়, আখিরাতের আদালতে।

আল্লাহ বলেন, “তাকেও আমি সামান্য কালের জন্য ভোগ করতে দেব।” কী কাঁপিয়ে দেওয়া বাক্য! মানুষের চোখে দুনিয়া দীর্ঘ, অথচ আল্লাহর ভাষায় তা সামান্য। মানুষ যে সম্পদের জন্য জীবন বিক্রি করে, যে ক্ষমতার জন্য বিবেক হারায়, যে ভোগের জন্য হালাল-হারামের সীমা ভাঙে, যে আরামের জন্য নামাজ হারায়—আল্লাহ সেই সবকিছুকে বলছেন সামান্য কালের ভোগ। কয়েকটি সকাল, কয়েকটি রাত, কিছু হাসি, কিছু স্বাদ, কিছু প্রশংসা, কিছু দখল—তারপর হঠাৎ দরজা বন্ধ। তারপর হিসাব।

দুনিয়ার ভোগের সবচেয়ে বড় প্রতারণা হলো, এটি মানুষকে স্থায়িত্বের অনুভূতি দেয়। মানুষ ভাবে, যেন এই বাড়ি থাকবে, এই শরীর থাকবে, এই ক্ষমতা থাকবে, এই সম্পর্ক থাকবে, এই সুযোগ থাকবে। অথচ প্রতিটি ভোগের ভেতরই বিদায়ের বীজ আছে। প্রতিটি আনন্দের পেছনে ক্ষয় আছে। প্রতিটি দেহের ভেতরে মৃত্যু কাজ করছে। প্রতিটি দিনের ভেতর কবরের দিকে অগ্রসর হওয়া লুকিয়ে আছে।

ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দোয়ায় “আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান” কথাটি এসেছে। কারণ যে মানুষ শেষ দিনের কথা ভুলে যায়, তার রিজিকও তাকে ধ্বংসের পথে নিতে পারে। রিজিক তখন নেয়ামত থাকে না; ফিতনা হয়ে যায়। সম্পদ তখন শান্তি দেয় না; অহংকার বাড়ায়। ক্ষমতা তখন ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে না; জুলুম বাড়ায়। আরাম তখন কৃতজ্ঞতা শেখায় না; গাফিলতি গভীর করে।

যে মানুষ আখিরাত মনে রাখে, সে রিজিককে আমানত ভাবে। সে জানে—আমার হাতে যা এসেছে, তা আমার মালিকানা নয়; পরীক্ষা। আমি কীভাবে উপার্জন করলাম, কোথায় খরচ করলাম, কার হক দিলাম, কার হক নিলাম—সব জিজ্ঞাসা হবে। তাই মুমিন রিজিক চায়, কিন্তু রিজিকের মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টিও চায়। সে শুধু ফলমূল নয়, বরকত চায়। শুধু সম্পদ নয়, হালাল চায়। শুধু প্রাচুর্য নয়, কৃতজ্ঞ হৃদয় চায়।

এই আয়াত আমাদের শেখায়—একটি শহরের প্রকৃত উন্নতি শুধু বাজার, রাস্তা, ভবন, আলো, ব্যবসা বা ফলমূলের প্রাচুর্যে নয়; প্রকৃত উন্নতি হলো নিরাপত্তা, ঈমান, ন্যায়, কৃতজ্ঞতা এবং আখিরাত-সচেতনতার সমন্বয়ে। মক্কার জন্য ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যে দোয়া করেছিলেন, তার ভেতরে একটি সভ্যতার নকশা আছে—নিরাপদ ভূমি, রিজিকপূর্ণ জীবন, এবং আল্লাহ ও শেষ দিনের বিশ্বাসে জাগ্রত মানুষ।

কিন্তু আল্লাহর জবাব আমাদের সতর্ক করে—দুনিয়াতে অবাধ্য মানুষও ভোগ পেতে পারে। তাই কারও দুনিয়াবি সাফল্য দেখে বিভ্রান্ত হয়ো না। কারও বিলাসিতা দেখে ঈর্ষায় জ্বলে ওঠো না। কারও প্রাচুর্য দেখে নিজের ঈমানকে ছোট মনে করো না। দুনিয়ার দরজা খুলে যাওয়া সবসময় রহমতের প্রমাণ নয়; কখনও কখনও তা পরীক্ষা, কখনও তা অবকাশ, কখনও তা ধীরে ধীরে ধরা পড়ার পথও হতে পারে।

আল্লাহর কাছে আসল প্রশ্ন হলো—তুমি ভোগ পেয়েছ, কিন্তু কৃতজ্ঞ হয়েছিলে কি? তুমি রিজিক পেয়েছ, কিন্তু হালাল রেখেছিলে কি? তুমি নিরাপত্তা পেয়েছ, কিন্তু আল্লাহর ঘরকে স্মরণ করেছিলে কি? তুমি শহর পেয়েছ, ঘর পেয়েছ, পরিবার পেয়েছ, ব্যবসা পেয়েছ—কিন্তু তোমার হৃদয় কি শেষ দিনের জন্য প্রস্তুত হয়েছিল?

“তারপর তাকে জাহান্নামের শাস্তির দিকে বাধ্য করব”—এই বাক্য দুনিয়ার মায়াকে ছিন্ন করে দেয়। মানুষ দুনিয়ায় নিজের ইচ্ছায় ভোগ করে, কিন্তু আখিরাতে নিজের ইচ্ছায় পালাতে পারবে না। দুনিয়ায় সে আল্লাহর ডাক এড়িয়ে যেতে পারে, নামাজ পিছিয়ে দিতে পারে, তাওবা বিলম্ব করতে পারে, সত্যের সামনে অজুহাত দিতে পারে। কিন্তু একদিন তাকে এমন পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখান থেকে পালানোর কোনো পথ নেই, যদি সে ঈমান ও তাওবা ছাড়া ফিরে যায়।

আর আল্লাহ বলেন—“তা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল!” মানুষ দুনিয়ায় কত গন্তব্য বানায়—বাড়ি, ব্যবসা, শহর, দেশ, পদ, পরিচয়। কিন্তু চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন কোথায় হবে, সেটিই আসল প্রশ্ন। কোনো মানুষের জীবনের মূল্য তার দুনিয়ার ঠিকানায় নয়; তার শেষ ঠিকানায়। যে দুনিয়ায় সামান্য ভোগের জন্য আখিরাত হারায়, সে সবচেয়ে বড় ক্ষতির ব্যবসা করে।

এই আয়াত আমাদের নিজেদের দোয়ার ভাষাও শিখিয়ে দেয়। আমরা রিজিক চাই, কিন্তু তার আগে নিরাপত্তা চাই। আমরা নিরাপত্তা চাই, কিন্তু তার চেয়েও বড় চাই ঈমান। আমরা ফলমূল চাই, কিন্তু তার চেয়েও বড় চাই আখিরাতের প্রস্তুতি। কারণ দুনিয়ার রিজিক যদি ঈমানকে বাঁচায়, তবে তা নেয়ামত। আর দুনিয়ার রিজিক যদি আল্লাহকে ভুলিয়ে দেয়, তবে তা পরীক্ষা—কখনও ভয়ংকর পরীক্ষা।

আজ আমরা যখন আল্লাহর কাছে জীবিকার দোয়া করি, তখন কি আমরা হালালের দোয়া করি? যখন ব্যবসার উন্নতি চাই, তখন কি বরকতের দোয়া করি? যখন নিরাপদ জীবন চাই, তখন কি পাপ থেকে নিরাপত্তাও চাই? যখন সন্তানদের জন্য ভবিষ্যৎ চাই, তখন কি তাদের ঈমানের ভবিষ্যৎও চাই? ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দোয়া আমাদের শেখায়—দুনিয়া চাইতে হলে আখিরাতের চোখ দিয়ে চাইতে হয়।

এই আয়াতের ভেতর সবচেয়ে বড় কম্পন এখানেই—দুনিয়া আল্লাহ দেন, কিন্তু দুনিয়া আল্লাহর সন্তুষ্টির নিশ্চয়তা নয়। কেউ দুনিয়া পেয়ে জান্নাতের পথে চলে, কেউ দুনিয়া পেয়ে জাহান্নামের দিকে এগোয়। পার্থক্য রিজিকে নয়; পার্থক্য হৃদয়ে। পার্থক্য ভোগে নয়; পার্থক্য শোকরে। পার্থক্য সম্পদে নয়; পার্থক্য ঈমান ও আখিরাত-সচেতনতায়।

তাই দুনিয়ার প্রাচুর্য দেখে মুগ্ধ হওয়ার আগে তার পরিণতি ভাবো। নিজের হাতে আসা নেয়ামত দেখে শুধু আনন্দিত নয়—সতর্ক হও। কারণ যা কিছু পেয়েছ, তা তোমাকে হয় আল্লাহর কাছে নিয়ে যাবে, নয়তো আল্লাহ থেকে দূরে সরাবে। তোমার রিজিক তোমার পক্ষে সাক্ষী হবে, নাকি বিরুদ্ধে—তা নির্ভর করছে তুমি তাকে কীভাবে গ্রহণ করেছ, কীভাবে উপার্জন করেছ, কীভাবে ব্যবহার করেছ।

একজন মুমিনের হৃদয় এই আয়াত পড়ে বলে—হে আল্লাহ, আমাকে দুনিয়া দিন, যদি তা আমার ঈমানের জন্য কল্যাণকর হয়। আমাকে রিজিক দিন, কিন্তু হারামের দরজা খুলে নয়। আমাকে নিরাপত্তা দিন, কিন্তু গাফিলতির নিরাপত্তা নয়। আমাকে ভোগ দিন, কিন্তু এমন ভোগ নয় যা শেষ পর্যন্ত আমাকে আপনার শাস্তির দিকে ঠেলে দেয়।
কারণ সামান্য কালের ভোগ শেষ হয়ে যাবে। শরীরের স্বাদ থেমে যাবে। চোখের আনন্দ নিভে যাবে। মানুষের প্রশংসা স্তব্ধ হবে। সম্পদের মালিকানা বদলে যাবে। কিন্তু আখিরাত থাকবে। আল্লাহর ফয়সালা থাকবে। আমলের হিসাব থাকবে।
তাই আজই হৃদয়কে জিজ্ঞাসা করি—আমি কি রিজিকের ভেতরে রবকে চিনছি, নাকি রিজিকের আড়ালে রবকে ভুলে যাচ্ছি? আমি কি নিরাপত্তাকে আল্লাহর পথে ব্যবহার করছি, নাকি নিরাপদ জীবন পেয়ে অবাধ্যতায় নিশ্চিন্ত হয়ে গেছি? আমি কি দুনিয়াকে আখিরাতের সেতু বানাচ্ছি, নাকি আখিরাতকে ভুলে দুনিয়াকেই গন্তব্য বানিয়ে ফেলেছি?
হে আল্লাহ, আমাদের নিরাপদ জীবন দিন, হালাল রিজিক দিন, বরকতময় দুনিয়া দিন; কিন্তু সবচেয়ে বেশি দিন এমন ঈমান, যা দুনিয়ার ভোগে হারিয়ে যায় না। আমাদের এমন অন্তর দিন, যা প্রতিটি নেয়ামতের আড়ালে আপনাকে দেখে, প্রতিটি রিজিকের মধ্যে হিসাবের ভয় রাখে, এবং সামান্য কালের ভোগের বদলে চিরস্থায়ী মুক্তির পথ বেছে নেয়।