তারা কি আল্লাহর পাকড়াওয়ের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে? এ প্রশ্নের ভেতরে এমন এক কাঁপন আছে, যা মানুষের অন্তরের আরামকে ভেঙে দেয়। কারণ মানুষ কত সহজে নিজের চারপাশের নিরাপত্তাকে সত্য মনে করে ফেলে—স্বাস্থ্য আছে, সম্পদ আছে, পরিকল্পনা আছে, মানুষ আছে, সময় আছে—তাই মনে হয় সব ঠিক আছে। কিন্তু কুরআন স্মরণ করিয়ে দেয়, দৃশ্যমান সুরক্ষা আর বাস্তব নিরাপত্তা এক জিনিস নয়। আল্লাহর পাকড়াও কখনো হঠাৎ নেমে আসে, কখনো ধীরে ধীরে মানুষের গাফিলতিকে ঘন করে তোলে, আর মানুষ টেরও পায় না যে সে ধ্বংসের দিকে কত নরম পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। এই আয়াত আমাদেরকে ভয় দেখানোর জন্য নয়; বরং এমন এক ঘুম থেকে জাগানোর জন্য, যার শেষ প্রান্তে জাগা খুব দেরি হয়ে যেতে পারে।
‘আল্লাহর পাকড়াও’ বলতে এখানে সেই ঐশী ধরা, শাস্তি, হঠাৎ পরিবর্তন, গোপন পরিকল্পনার উন্মোচন বোঝানো হয়েছে—যার সামনে মানুষ নিজের শক্তিকে তুচ্ছ পায়। এটি এমন কোনো ধারণা নয় যে আল্লাহ, মায়া-মমতার বিপরীতে, কেবল শাস্তির জন্য অপেক্ষা করছেন; বরং তিনি হেদায়াত দেন, অবকাশ দেন, সময় দেন, আবার সেই সময়কে অবজ্ঞা করলে মানুষের বিরুদ্ধে তাঁর ন্যায়বিচার কাজ করে। সূরা আল-আরাফের বিস্তৃত ধারায় আমরা দেখি জাতিসমূহের উত্থান-পতন, নবীদের সতর্কবার্তা, অহংকারীদের পতন, এবং সেই একই সত্য বারবার ফিরে আসে—যে জাতি, যে সমাজ, যে হৃদয় গাফিল হয়, সে নিজের পতন নিজেই ডেকে আনে। আদম-ইবলিসের কাহিনি থেকে শুরু করে পরবর্তী নবীদের ইতিহাস পর্যন্ত এই সূরার সুরই যেন বলে: নফসের প্রশ্রয়, অহংকার, ও সত্যকে অবহেলা মানুষকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করায়।
তাই এই আয়াত এক গভীর আধ্যাত্মিক আয়না। যে অন্তর আল্লাহকে ভুলে গিয়ে নিজের স্থিতি, নিজের ঈমান, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অহংকারে নিশ্চিন্ত হয়ে যায়, সে-ই সবচেয়ে বেশি বিপদে থাকে। মুমিনের নিরাপত্তা কখনো গাফলতের মধ্যে নয়; তার নিরাপত্তা থাকে তাকওয়ায়, তাওবায়, এবং আখিরাতের স্মরণে। ভয় এখানে হতাশা নয়—ভয় মানে জেগে থাকা, নিজের হিসাব নেওয়া, পাপের ওপর পর্দা টেনে না রাখা, আর রহমানের দরজায় ফিরে আসা। কারণ আল্লাহর পাকড়াও থেকে সত্যিকারের নিশ্চিন্ত কেবল তারাই হতে পারে, যাদের অন্তর ইতিমধ্যেই ধ্বংসের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। আর যে জীবিত, যে শুনতে পায়, যে নিজের রবের দিকে ফিরতে চায়—তার জন্য এই আয়াত দয়ার মতো কঠিন একটি ডাক: জাগো, আগে থেকেই ফিরে এসো, নইলে দেরি হয়ে যেতে পারে।
মানুষের অন্তর সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হয় তখনই, যখন সে আল্লাহর অবকাশকে নিজের নিরাপত্তা ভেবে বসে। গুনাহের পরও দুনিয়া ঠিকঠাক চলতে দেখা যায়, দু’আ বিলম্বিত হয়, শাস্তি চোখের সামনে আসে না, আর ধীরে ধীরে হৃদয় বলে ওঠে—সব তো ভালোই আছে। কিন্তু এ-ই গাফিলতির সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ। কারণ আল্লাহর পাকড়াও কোনো দুর্বল মানুষের তাড়া নয়; তা এমন এক হকীকত, যা মানুষকে তার নিজের সীমা দেখিয়ে দেয়। তিনি বান্দাকে ঢিল দেন, সুযোগ দেন, পথ খুলে দেন; আর বান্দা যদি সেই সুযোগকে অহংকারের আসনে বসিয়ে দেয়, তবে তার ধ্বংস শুরু হয় ঠিক তখন থেকেই, যখন সে নিজেকে নিরাপদ ভাবতে শেখে।
এ আয়াতের সামনে দাঁড়ালে তাওবা আর বিলম্বের মাঝের দূরত্ব হঠাৎ ভয়ংকর মনে হয়। কারণ গাফিল মানুষ ভাবে, পরে ফিরব; কিন্তু ‘পরে’ অনেক সময় আর আসে না। আল্লাহর মাকর সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়া মানে মূলত নিজের আত্মাকে মিথ্যার আশ্বাসে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া। আর ক্ষতিগ্রস্তরা তারাই, যারা সেই ঘুমকে শান্তি মনে করে। মুমিনের কাজ তাই ভয় আর আশার ভারসাম্য রক্ষা করা—ভয়ে কাঁপা, আবার রহমতের দ্বার থেকে ফিরে না আসা; গুনাহে লেগে না থাকা, আবার নিরাশও না হওয়া। এই আয়াত আমাদের সজাগ করে দেয়: হৃদয়কে আজই জাগাও, চোখের জলকে আজই সত্য করো, তাওবার দরজা আজই ধরে ফেলো। কারণ আল্লাহর কাছে ফেরা দেরি করে না, কিন্তু মানুষই বারবার দেরি করে বসে।
মানুষের বড় ধোঁকা হলো এই যে, সে নিজের চারপাশের আরামের পর্দাকে স্থায়ী নিরাপত্তা ভেবে বসে। সুস্থতা আছে, রিযিক আছে, লোকসমাজ আছে, সময় আছে—তাই মনে হয়, এখনো কিছুই ঘটেনি, এখনো আল্লাহর পাকড়াওয়ের ভয় করার মতো কিছু নেই। কিন্তু কুরআন এই ঘুম ভাঙিয়ে দেয়: আল্লাহর ধরা থেকে নিশ্চিন্ত হওয়া কোনো শান্তি নয়, এটা গাফিলতির শেষ সীমা। যে অন্তর নিজের ভুলের হিসাব নেয় না, যে সমাজ অন্যায়ের অভ্যাসকে স্বাভাবিক মনে করে, যে মানুষ তাওবা পিছিয়ে দিতে দিতে জীবনকে দীর্ঘ ভাবতে থাকে—সে আসলে ধ্বংসের দিকেই নরম পায়ে এগোচ্ছে।
এই আয়াত আমাদের ভয় আর আশার মাঝখানে দাঁড় করায়। ভয় এই কারণে যে, আল্লাহর মুমিনের অন্তর কখনো আত্মতৃপ্তিতে ডুবে যায় না; সে জানে, তার নেক আমলও আল্লাহর রহমত ছাড়া কিছুই নয়, আর তার গুনাহও তাওবা ছাড়া লুকোনোর জায়গা নয়। আবার আশা এই কারণে যে, পাকড়াওয়ের কথা স্মরণ করানোই প্রমাণ করে, ফিরে আসার দরজা এখনো খোলা। যতক্ষণ শ্বাস আছে, ততক্ষণ ফেরার পথ আছে; যতক্ষণ হৃদয় নরম হওয়ার ক্ষমতা রাখে, ততক্ষণ সিজদা, কান্না, ইস্তিগফার, সংশোধন—সবকিছুই সম্ভব। আল্লাহ মানুষকে ধ্বংস করতে চান না; তিনি জাগাতে চান, ফিরিয়ে আনতে চান, ভেঙে পড়া অন্তরকে আবার তাঁর দিকে দাঁড় করাতে চান।
তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা কেবল ‘আমি কী হারালাম’ নয়, বরং ‘আমি কোথায় গাফিল হলাম’—এই প্রশ্নই হৃদয়কে বাঁচায়। সমাজ যখন অন্যায়কে স্বাভাবিক করে, যখন অহংকার সত্যকে ঢেকে ফেলে, যখন মানুষ আখিরাতকে দূরের গল্প মনে করে—তখন আল্লাহর এই সতর্কবাণী এক মহাজাগরণ হয়ে আসে। মনে রাখতে হয়, নিরাপত্তা মানুষের হাতে নয়; নিরাপত্তা আছে সেই রবের হাতে, যিনি চাইলে শান্তির ভেতরেও পরীক্ষার দরজা খুলে দিতে পারেন, আর অশান্তির ভেতরেও হিদায়াতের আলো জ্বালিয়ে দিতে পারেন। সুতরাং গাফিলির নরম বিছানা ছেড়ে তাওবার কঠিন পথই নিরাপদ; কারণ আল্লাহর পাকড়াও থেকে সত্যিকারের ভয় করে কেবল সেই হৃদয়, যে ধ্বংসের আগে জেগে উঠেছে।
তাই মুমিনের জীবন কোনো গাফিল ঘুম নয়, বরং জাগ্রত তাওবার জীবন। সে ভয় পায়, কিন্তু হতাশ হয় না; সে কাঁপে, কিন্তু আল্লাহর রহমত থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না; সে নিজের আমল দেখে গর্বিত হয় না, আবার নিজের অপরাধ দেখে নিরাশও হয় না। এভাবেই সে প্রতি মুহূর্তে নিজের রবের দিকে ফেরে, নিজের অন্তরকে প্রশ্ন করে, আর জানে—সত্যিকারের নিরাপত্তা সম্পদে নয়, পদে নয়, মানুষের প্রশংসায় নয়; নিরাপত্তা আছে আল্লাহর আনুগত্যে, তাঁর ভয় ও ভালোবাসার মধ্যে, এবং তাঁর কাছে ভাঙা হৃদয়ে ফিরে আসায়।
সুরা আল-আরাফের এই শেষ সতর্কবাণী আমাদের হাতে আয়নার মতো ফিরে আসে: তুমি কি এখনো নিশ্চিন্ত? যদি হয়ে থাকো, তবে জেগে ওঠো। কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহর পাকড়াওকে ভুলে যায়, সে আসলে নিজের আত্মাকে ভুলে যায়। আর যে ব্যক্তি অন্তর থেকে বলে, হে আমার রব, আমি তোমার রহমতের মুখাপেক্ষী, তোমার শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই, আমাকে ক্ষমা করো, আমাকে সোজা পথে রাখো—তার জন্য এই ভয় আশার দরজা খুলে দেয়। কুরআন আমাদের ভয় দেখিয়ে ধ্বংস করতে চায় না; সে চায়, আমাদের ঘুম ভেঙে দিয়ে জীবিত করে তুলতে—যাতে আমরা আখিরাতের আগে ফিরে আসি, আর মৃত্যুর আগে সত্যিকারের নিরাপত্তা খুঁজে পাই।