আল্লাহ তাআলা এখানে এমন এক হৃদয়বিদারক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেছেন, যেখানে সত্যের জবাব সত্য দিয়ে নয়, বিদ্রূপ দিয়ে দেওয়া হয়। লূত আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় যখন তাঁর ডাকে সাড়া দিতে চায় না, তখন তারা তাঁর এবং তাঁর সঙ্গীদের সম্পর্কে বলে, ‘এদেরকে নিজেদের শহর থেকে বের করে দাও; এরা তো এমন লোক, যারা পবিত্র থাকতে চায়।’ এই বাক্যে শুধু একটি কটূক্তি নেই; আছে নৈতিক অন্ধতার পুরো মানচিত্র। যখন কোনো সমাজে পাপ স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন তাকওয়া অস্বাভাবিক মনে হয়। তখন পবিত্রতা আর সৌন্দর্য নয়, বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই আয়াত আমাদের শেখায়, সত্যের প্রতি শত্রুতা অনেক সময় সরাসরি অস্বীকারের ভাষায় আসে না; আসে ব্যঙ্গের মুখোশে। তারা নবি ও ঈমানদারদের দোষ ধরতে পারেনি, তাই তাদের পবিত্রতাকেই দোষ বানাল। যেন ইশারা করল—তোমাদের এই নিষ্কলুষতা, এই সংযম, এই আল্লাহভীতি আমাদের সমাজের রুচির সঙ্গে যায় না। বস্তুত, যে সমাজ হালাল-হারামের সীমা সহ্য করতে পারে না, যে সমাজ মানুষের আত্মশুদ্ধিকে ‘অতিরিক্ত’ বলে ঠেলে দিতে চায়, সে সমাজ নিজেরই অন্তর্গত পতনকে প্রকাশ করে। বাহ্যিক সভ্যতা যতই উঁচু হোক, অন্তরের পচন ঢাকা থাকে না।
এখানে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কারণ বর্ণনা না করে কুরআনের ধারাবাহিক বয়ানের আলোতেই বুঝতে হয়—এটি এমন এক জনপদের গল্প, যেখানে নবীর আহ্বানকে উপহাস করা হয় এবং নৈতিক শুদ্ধিকে সামাজিক অপরাধ বানানো হয়। সূরা আল-আরাফের এই অংশে আদম-ইবলিসের আদি সংঘাত থেকে শুরু করে বহু জাতির পরিণতির কথা আসছে; তাই এই আয়াত একটি ব্যক্তি-ঘটনার চেয়ে বৃহত্তর এক চিরন্তন সত্য উচ্চারণ করছে। আল্লাহর পথে চলা মানুষকে দুনিয়ার ভিড় কতবার অচেনা ভাববে, কতবার একঘরে করতে চাইবে—কিন্তু আখিরাতের মানদণ্ডে বিজয় তাদেরই, যারা নিজেদেরকে আল্লাহর কাছে পবিত্র রাখতে চেয়েছে।
কখনো কখনো বাতিলের সবচেয়ে ভয়ংকর জবাব আসে যুক্তির ভাষায় নয়, তাচ্ছিল্যের ভাষায়। লূত আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় সত্যের মুখোমুখি হয়ে সত্যকে খণ্ডন করতে পারেনি; তাই তারা বিদ্রূপকে আশ্রয় নিল—“এদেরকে শহর থেকে বের করে দাও, এরা তো খুব পবিত্র থাকতে চায়।” এই একটি বাক্যের ভেতর লুকিয়ে আছে নৈতিক পতনের এক ভয়াবহ সাক্ষ্য। যে সমাজ পাপকে আপন করে নেয়, সেই সমাজের কাছে পবিত্রতা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে; যে হৃদয় গুনাহে অভ্যস্ত, তার কাছে তাকওয়া আর প্রশান্তি নয়, বরং বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তখন নেককার মানুষকে অপরাধী বানানো হয়, আর অপরাধকে স্বাভাবিক বলে ঘোষণা করা হয়।
এই আয়াত আমাদের অন্তরকে জিজ্ঞেস করে: আমি কি এমন এক সমাজের অংশ, যেখানে সৎ থাকা লজ্জার বিষয় হয়ে গেছে? আমি কি এমন এক হৃদয় নিয়ে বেঁচে আছি, যেখানে গুনাহের স্বস্তি, আর ইবাদতের ভার? আল্লাহর পথে চলা মানুষকে কখনো কখনো একা দাঁড়াতে হয়, অবজ্ঞার মুখোমুখি হতে হয়, এমনকি স্থানচ্যুতি, নিঃসঙ্গতা, অপবাদও বয়ে নিতে হয়। কিন্তু তাকওয়ার মূল্যমান জনতার করতালিতে নয়; সেটি নির্ধারিত হয় রহমানের দৃষ্টিতে। যে অন্তর আজ পবিত্রতাকে ভালোবাসে, সে-ই একদিন আলোর দিকে ফিরবে; আর যে সমাজ পবিত্রতাকে উপহাস করে, তার অন্ধকার নিজেকেই গ্রাস করবে।
এই আয়াতে একটা সমাজের আত্মিক মুখোশ খুলে যায়। তারা নবী ও তাঁর সঙ্গীদের বিরুদ্ধে কোনো শক্ত যুক্তি আনতে পারে না, কোনো ন্যায্য অভিযোগ দাঁড় করাতে পারে না; তাই শেষ আশ্রয় হয় বিদ্রূপ। পবিত্র মানুষকে তারা ‘অতিরিক্ত পবিত্র’ বলে ঠেলে দিতে চায়, যেন তাকওয়া কোনো অপরাধ। যখন অন্তর নষ্ট হয়ে যায়, তখন শালীনতা অস্বস্তির কারণ হয়; যখন গুনাহ অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন সংযমকে মনে হয় সমাজবিরোধী। এভাবেই আল্লাহর দিকে ফেরার আহ্বানকে সমাজ কখনও কখনও ভালোবাসা দিয়ে নয়, অপমান দিয়ে জবাব দেয়। কিন্তু এই অপমান আসলে সত্যের পতন নয়; বরং পতিত সমাজের নিজের দুর্বলতা প্রকাশ।
এই দৃশ্য আমাদের নিজের ভেতরেও প্রশ্ন তোলে: আমি কি এমন কোনো অবস্থায় পৌঁছে গেছি, যেখানে পবিত্রতা আমাকে টানে না, বরং বিরক্ত করে? আমি কি এমন কোনো পরিবেশকে স্বাভাবিক মেনে নিয়েছি, যেখানে গুনাহকে উদারতা বলা হয়, আর আল্লাহভীতিকে সংকীর্ণতা? সূরা আল-আরাফের এই আয়াত যেন হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে—তুমি কি সত্যের পাশে থাকবে, নাকি ভিড়ের সঙ্গে পবিত্রতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে? দুনিয়ার সমাজ যতই উচ্চস্বরে হোক, আখিরাতের আদালতে শব্দের নয়, অবস্থা-অবস্থানের হিসাব হবে। সেদিন লজ্জা পাবে তারা, যারা আল্লাহর দিকে ফেরার মানুষকে তাড়াতে চেয়েছিল; আর সান্ত্বনা পাবে তারা, যারা নিন্দা সহ্য করেও নিজেদের অন্তরকে পবিত্র রেখেছিল।
এখানে এক অদ্ভুত সত্য ধরা পড়ে: অনেক সময় সমাজ নিজের অপরাধ ঢাকতে গিয়ে সৎ মানুষকে ‘অস্বাভাবিক’ বলে। তারা পাপকে পরিচয় বানায়, আর পবিত্রতাকে ব্যতিক্রম বলে। অথচ আল্লাহর কাছে অস্বাভাবিক কিছু নয়; অস্বাভাবিক হলো সেই হৃদয়, যা সত্যের আলো দেখে কেঁপে ওঠে না। লূত আলাইহিস সালামের জাতির এই জবাব আসলে তাদের অন্তরের অবস্থাই প্রকাশ করে—যেখানে শুদ্ধতা দোষ, সেখানে অবক্ষয়ই নিয়ম। যেখানে নসীহতকে ঘৃণা করা হয়, সেখানে ধ্বংস শুধু সময়ের ব্যাপার।
এই আয়াত আমাদেরও মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমরা কি এমন সমাজের অংশ হয়ে গেছি, যেখানে তাকওয়াকে সরলতা বলে তাচ্ছিল্য করা হয়, আত্মসংযমকে দুর্বলতা বলে হেয় করা হয়, আর আল্লাহভীতিকে ‘অতিরিক্ত’ মনে করা হয়? যদি তাই হয়, তবে আমাদের অন্তরেও লূত-জাতির সেই ছায়া নেমে এসেছে। তাই আজ দরকার নীরব কান্না, নিজেকে সংশোধন করা, পাপকে স্বাভাবিক ভাবার অভ্যাস ভেঙে ফেলা। কারণ যে হৃদয় পবিত্রতাকে ভালোবাসে, সে হৃদয়ই শেষ পর্যন্ত আখিরাতের আলো চিনতে পারে। আর যে হৃদয় বিদ্রূপের মধ্যে বাঁচে, সে একদিন নিজেরই ধ্বংসের শব্দ শুনবে।