আল্লাহর কিতাবে এই আয়াতটি যেন এক নীরব কিন্তু বজ্রনিনাদী বিদায়বাক্য। হযরত ছালেহ (আ.) তাঁর জাতির সামনে সত্যকে পুরোপুরি পৌঁছে দিয়েছেন, মঙ্গলকামনার কোনো ঘাটতি রাখেননি; তবু যখন হৃদয়গুলো নরম হলো না, তখন নবীর ভাষায় এক অসহায় কিন্তু মহিমান্বিত ঘোষণা ভেসে ওঠে: আমি আমার রবের বার্তা পৌঁছে দিয়েছি, আমি তোমাদের কল্যাণই চেয়েছি, কিন্তু তোমরা কল্যাণকামীদের ভালোবাস না। এখানে নবীর দায়িত্বের পূর্ণতা আর মানুষের অস্বীকৃতির করুণ মুখোমুখি অবস্থান—দু’টিই একসঙ্গে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সত্যের রাস্তা কখনোই নিষ্ফল হয় না; বরং মানুষের বেছে নেওয়া অন্ধত্বই তাকে নিজের পতনের দিকে ঠেলে দেয়।
এই বাক্যগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে নবীদের কাহিনির সেই চিরন্তন ধারা: তাঁরা ক্ষমতা চান না, প্রতিদান চান না, কেবল হিদায়াত পৌঁছাতে চান। কিন্তু যে সমাজ নিজের অহংকারকে ভালোবাসে, তার কাছে নসিহতও বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আয়াতটি কোনো বিচ্ছিন্ন বাক্য নয়; এটি সালেহ (আ.)-এর দাওয়াত, তাঁর সম্প্রদায়ের অবাধ্যতা, এবং সত্য প্রত্যাখ্যানের দীর্ঘ সামাজিক রূপের এক গভীর পরিণতি। এখানে শিখে রাখা যায়—নবীর কাজ মানুষকে বাধ্য করা নয়, বরং সত্যকে স্পষ্ট করে তোলা; আর মানুষের কাজ হলো সেই সত্যের সামনে নত হওয়া। যখন মানুষ নসিহতপ্রিয় হৃদয় হারায়, তখন আখিরাতের পথও তার কাছে ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যায়।
এ কারণে এই আয়াত শুধু এক নবী ও এক জাতির ইতিহাস নয়; এটি প্রতিটি যুগের মানুষের আয়না। আজও কেউ যদি কল্যাণের কথা শুনে কুঁকড়ে যায়, আল্লাহর সীমার কথা শুনে ক্ষুব্ধ হয়, তবে সে আদতে কোনো ব্যক্তিকে নয়, বরং নিজেরই আত্মাকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়। সালেহ (আ.)-এর এই বিদায়বাণীতে আমরা শুনি দায়িত্বশীলতার শেষ সাক্ষ্য, আর অপরদিকে শুনি অবাধ্যতার নীরব অভিশাপ। যে হৃদয় নসিহতকে গ্রহণ করে, তার জন্য বাক্যগুলো হিদায়াতের দরজা খুলে দেয়; আর যে হৃদয় নসিহতকে ঘৃণা করে, তার জন্য সত্যও একদিন শুধু বিদায়ের ধ্বনি হয়ে ফিরে আসে।
নবীর কণ্ঠস্বর যখন বলে, “আমি তোমাদের কাছে আমার রবের বার্তা পৌঁছে দিয়েছি, আমি তোমাদের মঙ্গলই চেয়েছি”, তখন সেখানে কেবল একটি বক্তব্য থাকে না—থাকে আসমানের সামনে দাঁড়ানো এক জীবনের সাক্ষ্য। ছালেহ (আ.)-এর বিদায়ের এই বাক্যে নবুয়তের সমস্ত ভার, সমস্ত ধৈর্য, সমস্ত করুণা একত্র হয়ে ঝরে পড়ে। তিনি তাদের জন্য শত্রু ছিলেন না; ছিলেন দরদী সতর্ককারী। তিনি নিজের জন্য কিছু চাননি, তাদের অন্তরের ভেতর লুকিয়ে থাকা ধ্বংসের আগুনকে নিভিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মানুষের সবচেয়ে করুণ অন্ধত্ব হলো—যে হাতে সুস্থতার ওষুধ আসে, তাকেই সে অপমান করে; যে হৃদয় বাঁচাতে আসে, তাকেই সে ক্লান্ত করে; যে সত্যের আয়না ধরে, তাকেই সে অপছন্দের চোখে দেখে।
আর এ কারণেই কুরআন আমাদের কেবল অতীতের কাহিনি শোনায় না; আমাদের আজকের হৃদয়ও পরীক্ষা করে। আমি কি নসিহত শুনতে ভালোবাসি, নাকি প্রশংসার নরম ছায়ায় ডুবে থাকতে চাই? আমি কি আমার রবের পয়গামকে স্বাগত জানাই, নাকি সংশোধনকারী মুখগুলোকে দূরে ঠেলে দিই? ছালেহ (আ.)-এর এই বিদায়বাক্য আখিরাতের দরজায় দাঁড়ানো এক ভয়াবহ প্রশ্নের মতো: যখন নবীর দায়িত্ব পূর্ণ, তখন মানুষের পক্ষে আর কী অজুহাত থাকে? তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়, সত্যকে ভালোবাসা মানে নিজের পতন থামানোর ইচ্ছা; আর নসিহতকে ঘৃণা করা মানে নিজের হাতে নিজের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া।
হযরত ছালেহ (আ.)-এর এই বিদায়বাক্য কেবল এক নবীর কণ্ঠস্বর নয়; এটি সত্যের পক্ষ থেকে মানুষের অন্তরের দিকে নিক্ষিপ্ত শেষ দৃষ্টিপাত। তিনি থেমে যান, কিন্তু তাঁর দাওয়াত থেমে থাকে না। তিনি প্রস্থান করেন, কিন্তু তাঁর রবের বার্তা মানুষের বিবেকের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে। নবীর ভাষায় কত গভীর প্রশান্তি—আমি পৌঁছে দিয়েছি, আমি কল্যাণ চেয়েছি। এখানে নবী নিজের পক্ষে কোনো বিজয়ের দাবি করছেন না; তিনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, আল্লাহর হক আদায় হয়েছে। আর এই সাক্ষ্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক কঠিন শিক্ষা: আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ভারী বোঝা হলো সেই হৃদয়, যা নসিহত শুনেও নরম হয় না, হিদায়াতের ডাক শুনেও ফিরে তাকায় না।
মানুষ যখন নসিহতকে অপছন্দ করতে শেখে, তখন তার পতন অনেক আগেই শুরু হয়ে যায়—শুধু সেটা প্রকাশ পেতে কিছু সময় লাগে। সত্যের আহ্বান কখনো মানুষের ওপর জবরদস্তি করে না; সে কেবল পথ দেখায়, জাগিয়ে তোলে, সতর্ক করে। কিন্তু অহংকার, গাফিলতি আর আত্মপ্রেম যখন সমাজের ভেতর শিকড় গেড়ে বসে, তখন উপদেশও শত্রুতা বলে মনে হয়, মঙ্গলকামনাও বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই আয়াতে যেন মানবসমাজের এক করুণ আয়না ধরা আছে: নবীরা দয়ার ভাষায় কথা বলেন, আর অনেকেই সেই দয়ার মুখে রুক্ষতার পর্দা টেনে দেয়। এটাই জাতিসমূহের পতনের সূচনা—যখন সত্যকে অস্বীকার করা কেবল ভুল হয় না, অভ্যাসে পরিণত হয়।
তাই এই আয়াত আমাদের সামনে শুধু ছালেহ (আ.)-এর কাহিনি নয়, নিজের হিসাবের দরজাও খুলে দেয়। আমি কি নসিহতপ্রিয় হৃদয় নিয়ে বাঁচি, না নসিহত শুনলেই সংকুচিত হই? আল্লাহর বাণী, কুরআনের সতর্কতা, মুমিন ভাইয়ের আন্তরিক পরামর্শ—এসব কি আমার জন্য রহমত, নাকি আমার অহংকারের সামনে আঘাত? যে হৃদয় নসিহতকে ভালোবাসে, সে ধীরে ধীরে আল্লাহর দিকে নরম হয়; আর যে হৃদয় নসিহতকে ঘৃণা করে, সে নিজের হাতেই আখিরাতের পথ সংকীর্ণ করে। আজ এই আয়াত আমাদের শেখায়, সত্যের সাক্ষ্য মানুষের কাছে পৌঁছে গেলেও শেষ কথা রয়ে যায় আত্মসমর্পণের; আর যে আত্মা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, সে-ই জানে—উপদেশ আসলে বোঝা নয়, বরং রক্ষাকবচ।
নবীদের কণ্ঠস্বর কখনো প্রতিশোধের নয়, তা মায়াময় দায়িত্বের। ছালেহ (আ.) চলে যাচ্ছেন, কিন্তু তাঁর প্রস্থান কোনো পরাজয় নয়; তা মানুষের অন্তরের ওপর এক চূড়ান্ত সাক্ষ্য। বার্তা পৌঁছে গেছে, নসিহত সম্পূর্ণ হয়েছে, কল্যাণ চাওয়া হয়েছে—এরপরও যদি হৃদয় নরম না হয়, তবে দোষ নবীর নয়, দোষ সেই আত্মার, যে সত্যকে শোনে কিন্তু গ্রহণ করে না। এই আয়াত আমাদের সামনে এক কঠিন আয়না ধরে: আমরা কি এমন জাতি হয়ে উঠেছি, যারা উপদেশ শুনি কেবল জবাব দেওয়ার জন্য, বদলানোর জন্য নয়? যাদের কাছে সত্য আসে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অহংকার তার দরজা বন্ধ করে দেয়?
এখানেই এই বাক্যের তীব্রতা। কিয়ামতের ময়দানে মানুষ অনেক অজুহাত দাঁড় করাতে চাইবে, কিন্তু নবীর এই ঘোষণা তাদের মুখ বন্ধ করে দেবে: আমি পৌঁছে দিয়েছি, আমি কল্যাণ চেয়েছি। তারপর থাকে শুধু আমাদের নিজের আমল, নিজের অনুতাপ, নিজের তাকওয়া। যে জাতি নসিহতকে ভালোবাসে না, সে আসলে নিজের শেষটাকেই সহজ করে; আর যে হৃদয় আল্লাহর উপদেশে কেঁপে ওঠে, সে-ই ধীরে ধীরে বাঁচতে শেখে। তাই আজ যদি কুরআনের এই বিদায়বাক্য আমাদের অন্তরকে নাড়া দেয়, তবে সেটাই রহমত। কারণ হৃদয় ভেঙে গেলে তাওবা জন্মায়, আর তাওবা জন্মালে অন্ধকারও হঠাৎ অপসৃত হয়। আল্লাহ যেন আমাদেরকে এমন হৃদয় দান করেন, যা নসিহতকে ভালোবাসে, সত্যকে মানে, এবং আখিরাতের আগে নিজেকে ঠিক করে নেয়।