কওমের সর্দাররা যখন নবীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে, “আমরা তোমাকে নির্বোধ দেখছি, আর তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করছি,” তখন আসলে তারা নবীর মর্যাদা নিয়ে নয়, নিজেদের অহংকার নিয়েই কথা বলে। সূরা আল-আরাফের এই আয়াত আমাদের সামনে এক পুরোনো কিন্তু চিরনতুন মানবিক রোগকে উন্মোচন করে: সত্য যখন মানুষের স্বার্থ, সামাজিক ক্ষমতা, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্রতিপত্তি আর আত্মগরিমার সঙ্গে সংঘর্ষে আসে, তখন অনেকেই সত্যকে বিচার করে না, অপমান করে। তারা যুক্তি খোঁজে না; তারা লেবেল দেয়। তারা হিদায়াতের ডাক শোনে না; তা-কে হেয় করে। আর এভাবেই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সতর্কবাণীকে তারা “সَفَاهَة” — নির্বুদ্ধিতা — বলে উড়িয়ে দিতে চায়। কিন্তু এই শব্দের আড়ালে প্রকৃত নির্বুদ্ধিতা কার, তা পাঠক হৃদয়ই বুঝে ফেলে: নবীর নরম, স্বচ্ছ, আলোকিত আহ্বানকে অস্বীকার করা, আর নিজের অন্ধত্বকে বুদ্ধিমত্তা ভেবে বসে থাকা।

এই বক্তব্যের ব্যাপক কুরআনিক প্রেক্ষাপটও গভীর। সূরা আল-আরাফে আদম-ইবলিসের সেই আদিম সংঘাতের স্মৃতি আছে, আছে বহু জাতির পতনের কাহিনি, আছে এমনই সব কওমের গল্প যাদের শক্তি ছিল, কিন্তু তাকওয়া ছিল না; সম্পদ ছিল, কিন্তু ন্যায়ের সামনে নত হওয়ার হৃদয় ছিল না। এখানে বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার সহিহ ও সুস্পষ্ট কারণ বর্ণিত না থাকলেও কুরআনের সামগ্রিক ভাষ্য থেকে বোঝা যায়—নবীদের প্রতি এই অবজ্ঞা কোনো এক জাতির একক আচরণ নয়, বরং মানবসমাজের বহু স্তরে বারবার ফিরে আসা এক মানসিকতা। ক্ষমতাবানরা প্রায়ই সত্যের প্রথম শত্রু হয়, কারণ সত্য তাদের ভেতরের ভ্রান্ত নিরাপত্তাকে ভেঙে দেয়। তাই তারা নবীকে মিথ্যাবাদী বলে, যেন সত্যের আলো নেভানো যায়। কিন্তু আল্লাহর আলো মানুষের ঠাট্টায় নিভে না; বরং ঠাট্টাকারীরাই ধীরে ধীরে নিজের অন্ধকারে বিলীন হয়।

এই আয়াত আমাদের অন্তরে এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়: আমরা যখন কোনো নসিহত শুনি, কেমন প্রতিক্রিয়া দিই? মানুষ কি আমাদের অন্তরে সত্যের জন্য জায়গা খোলা রেখেছে, নাকি নিজেদের পছন্দ-অপছন্দকে সত্যের আসনে বসিয়ে দিয়েছি? আজও বহু মানুষ সালাহ্, তাকওয়া, পরকালের জবাবদিহি, হালাল-হারাম, আত্মশুদ্ধি—এসবকে “অতিরিক্ত কঠোরতা” বা “অপ্রয়োজনীয়তা” ভেবে হালকাভাবে দেখে। অথচ কুরআন শেখায়, সত্যকে নির্বোধ বলা আসলে নিজের বিবেককে নির্বাসনে পাঠানো। এই আয়াত তাই শুধু অতীতের এক কওমের নিন্দা নয়; এটি প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য আয়না। যে হৃদয় আল্লাহর স্মরণে নরম হয় না, সে একদিন নিজের কথাকেই সত্য ভাবতে শুরু করে; আর যে হৃদয় তাকওয়ার আলোয় সেজদায় ঝুঁকে পড়ে, তার কাছে নবীর আহ্বান নির্বুদ্ধিতা নয়, বরং মুক্তির পথ।

এই আয়াতে কওমের সর্দাররা কেবল একজন নবীকেই আঘাত করেনি; তারা আসলে সত্যের মুখে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভেতরের অন্ধকারকে রক্ষা করতে চেয়েছে। যখন হিদায়াত মানুষের অহংকার, স্বার্থ আর সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বের দেয়ালে ধাক্কা খায়, তখন সত্যকে তারা সত্য হিসেবে দেখে না; তাকে “সَفَاهَة” বলে ঠেলে সরিয়ে দিতে চায়। কুরআনের এই দৃশ্য আমাদের জানিয়ে দেয়, মানুষ কখনো কখনো নিজের অন্তরের ভারসাম্য হারায় না-সত্যের কারণে, বরং সত্যকে মেনে নেওয়ার দায় থেকে পালাতে গিয়ে। নবীর আহ্বান যুক্তির অভাব ছিল বলে নয়, বরং তাদের হৃদয়ে তাকওয়ার জায়গা খালি ছিল বলে তারা তা অপমানের ভাষায় ফিরিয়ে দিল।

এখানেই মানব ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়: আদম-ইবলিসের সংঘাতে যেমন ইবলিস অহংকারকে বেছে নিয়েছিল, তেমনি বহু কওমের পতনের পেছনেও ছিল এই এক রোগ—সত্য সামনে এলে বিনয়ের বদলে ঔদ্ধত্য। যারা নিজেদের ক্ষমতা, বংশ, জমায়েত, নেতৃত্ব বা প্রথাকে আল্লাহর নির্দেশের চেয়ে বড় মনে করে, তাদের কাছে নবীর কথা সবসময়ই অস্বস্তিকর শোনায়। তারা আগে শুনে, তারপর বোঝে না; আগে বিচার করে, তারপর অস্বীকার করে। আর এই অস্বীকৃতি শুধু একজন বার্তাবাহকের প্রতি অবিচার নয়, বরং আখিরাতের দিকে ধাবিত এক নরম অথচ ভয়ংকর পতন। কারণ হিদায়াতকে ঠাট্টা করা মানে নিজের অন্তরকেই অন্ধতার হাতে তুলে দেওয়া।
তাই এই আয়াত আমাদের জন্য কেবল ইতিহাস নয়, আয়না। আজও সত্য অনেক সময় নরম কণ্ঠে আসে, কিন্তু মানুষ তাকে দুর্বল ভেবে উড়িয়ে দেয়; আজও তাকওয়ার ডাককে অনেকে সাদামাটা ভেবে উপেক্ষা করে; আজও আল্লাহর পথে ফেরার আহ্বানকে কেউ কেউ নির্বুদ্ধিতা মনে করে। কিন্তু দিনশেষে প্রশ্নটি থাকে একটাই—কে সত্যিই সঠিক, আর কে সত্যকে সহ্য করতে না পেরে তাকে মিথ্যা বলেছে? এই প্রশ্ন কিয়ামতের ময়দানেও ফিরে আসবে, যখন শব্দের আড়াল থাকবে না, প্রতিপত্তির পর্দা ছিঁড়ে যাবে, আর মানুষের অন্তরের আসল চেহারা প্রকাশিত হবে। তখন বোঝা যাবে, সত্যকে নির্বোধ বলা কোনো বুদ্ধিমত্তা ছিল না; ছিল আত্মাকে ধ্বংস করার এক অহংকারময় ভুল।

কওমের সর্দাররা বলল, “আমরা তোমাকে নির্বোধ দেখছি, আর তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করছি”—এই কথার মধ্যে কেবল একটি ব্যক্তিকে অপমান করার চেষ্টা নেই; এর মধ্যে আছে সত্যের বিরুদ্ধে সমাজের সংগঠিত অহংকার। যখন হৃদয় আল্লাহর দিকে ফেরার আহ্বান শুনেও নিজেকে বদলাতে চায় না, তখন সে প্রথমে নবীকে ছোট করে, তারপর নিজের অন্ধতাকেই নীতিবোধ বলে চালাতে চায়। এটাই মানুষের পুরোনো রোগ: সত্য সামনে এলে তাকে বিচার করার বদলে তাকে হেয় করা। কুরআন বারবার দেখায়, নবীদের অবমাননা নতুন কিছু নয়; নতুন হলো মানুষের এই ভ্রান্ত বিশ্বাস—ক্ষমতা থাকলে সত্যকে চাপা দেওয়া যাবে। কিন্তু যে কণ্ঠ আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, তাকে নির্বোধ বলা শেষে নিজেদেরই হৃদয়কে অন্ধ করে দেয়।

এই আয়াত আমাদের ভেতরের দরজায় কড়া নাড়ে। আমি কি কখনো এমন হয়েছি যে, সত্য আমার পছন্দের বিপরীতে গেলে তাকে “অতিরঞ্জন”, “কঠোরতা” বা “অবাস্তবতা” বলে এড়িয়ে যাই? আমি কি সমাজের স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হিদায়াতকে ছোট দেখি? এ প্রশ্নগুলো ভয় জাগায়, আবার আশাও জাগায়—কারণ এখনো ফিরে আসার সময় আছে। আল্লাহ মানুষের জিহ্বার তিরস্কারে প্রতারিত হন না; তিনি অন্তরের ওজন জানেন। সুতরাং যে হৃদয় আজও নরম, যে আত্মা আজও নিজের ভুল বুঝতে পারে, তার জন্য দরজা বন্ধ হয়নি। তাকওয়া মানে কেবল ভয় পাওয়া নয়, বরং সত্যকে সম্মান করে নিজের আত্মাকে রক্ষা করা। আর আখিরাতের স্মৃতি আমাদের শেখায়: মানুষ আজ যাকে “সফাহাহ” বলে উড়িয়ে দেয়, কিয়ামতের দিনে সেই সত্যই হবে নাজাতের মানদণ্ড।

কওমের সর্দাররা নবীকে “নির্বোধ” বলে ডেকে আসলে নিজেদেরই অন্তঃসারশূন্যতাকে প্রকাশ করেছিল। কারণ সত্য যখন হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে, তখন অহংকার প্রথমে কানে হাত দেয়, তারপর জিহ্বায় বিষ এনে দেয়। তারা বুঝতে চায়নি যে নবীর আহ্বান কোনো ব্যক্তিগত খেয়াল নয়; তা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য আলো, জাগরণ, ফিরে আসার সুযোগ। কিন্তু দম্ভে ডুবে যাওয়া চোখ আলোকে দেখে ধুলোর মতো, আর হিদায়াতের ডাককে শোনে অপমানের উপকরণ হিসেবে। এভাবেই মানুষ কখনো কখনো নিজের জ্ঞান, বংশ, নেতৃত্ব, সামাজিক অবস্থান—সবকিছুকে সত্যের ওপরে বসিয়ে দেয়; তারপর আল্লাহর বান্দাকে ছোট করে দেখিয়ে ভাবে, সে নিজেই বড় হয়ে গেল।

এই আয়াত আমাদের থামিয়ে দেয়। কারণ সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে কাউকে তুচ্ছ বলা যত সহজ, আখিরাতে তার হিসাব ততই কঠিন। আজও মানুষ কুরআনের আহ্বানকে অস্বস্তি মনে করে, তাকওয়াকে দুর্বলতা ভাবে, তাওবাকে পিছিয়ে পড়া মনে করে, আর গুনাহের সঙ্গে আপস করাকে বুদ্ধিমত্তা ভেবে নেয়। কিন্তু সূরা আল-আরাফ বারবার মনে করিয়ে দেয়—যে হৃদয় হিদায়াতকে অপমান করে, সে একদিন নিজেরই ভাঙনকে সত্য বলে চিনবে; তখন আর প্রত্যাখ্যানের শব্দ ফিরিয়ে আনা যাবে না। তাই এই আয়াতের সামনে এসে আমরা অহংকারের ভাষা নয়, বিনয়ের অশ্রু চাই; যুক্তির জাঁকজমক নয়, সত্যের কাছে নত হওয়া চাই। হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরকে এমনভাবে নরম করুন যেন আমরা সত্যকে চিনতে পারি, নবীদের পথে সাড়া দিতে পারি, আর নিজেদের দম্ভকে সময়মতো ভেঙে তাওবার দরজায় ফিরে আসতে পারি।