কখনো কখনো মানুষ দ্বীনকে হৃদয়ের গভীর আহ্বান হিসেবে গ্রহণ করে না; তাকে বানিয়ে ফেলে কেবল পরিচয়ের খোলস, সামাজিক রেওয়াজ, কিংবা মুখের উচ্চারণ। এ আয়াত সেই ভয়ংকর আত্মপ্রতারণার দিকে আঙুল তোলে: যারা তাদের ধর্মকে খেলাধুলা ও তামাশায় পরিণত করেছিল, আর দুনিয়ার চকচকে জীবন যাদের চোখে সত্যকে আড়াল করে রেখেছিল। দ্বীন যখন অন্তরের জাগরণ না হয়ে বাহ্যিক অভ্যাসে নেমে আসে, তখন মানুষ নিজেই নিজের উপর পর্দা টেনে দেয়। সে ভাবে, সময় আছে; হিসাব পরে হবে; আখিরাত দূরে। অথচ এই ভুলে থাকার মধ্যেই আস্তে আস্তে ঈমানের প্রাণ শুকিয়ে যায়।
আয়াতের বক্তব্য অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু করুণাময় সতর্কবাণীও বটে। এখানে কুরআন এক গভীর ন্যায়বিচারের ভাষা ব্যবহার করেছে: তারা যেমন সেই দিনের সাক্ষাৎকে ভুলে গিয়েছিল, আজ তাদেরও ‘ভুলে যাওয়া’ হবে। আল্লাহর স্মরণ ভোলার পরিণাম এমন এক আত্মিক নির্বাসন, যেখানে মানুষ তার নিজের করা অস্বীকারেরই মুখোমুখি হয়। এটি কেবল এক ব্যক্তিগত নৈতিক পতনের কথা নয়; এটি সমগ্র মানবসমাজের এক চিরন্তন দুর্ভাগ্য—যখন সত্যকে তামাশা ভাবা হয়, যখন নাজাতের আহ্বানকে হালকা মনে করা হয়, তখন হৃদয় কঠিন হয়ে যায়, আর কঠিন হৃদয়ের পরিণাম হলো আখিরাতের বিস্মৃতি।
সূরা আল-আরাফে আদম ও ইবলিসের কাহিনি, নবীদের দাওয়াত, আর পূর্ববর্তী জাতিগুলোর পতনের স্মৃতি বারবার ফিরে আসে—যেন মানুষ দেখে বুঝতে পারে, হিদায়াতের পথ কখনো খেলনা নয়। এ আয়াত সেই বৃহত্তর ধারাবাহিকতারই একটি তীক্ষ্ণ মোড়: যারা আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করে, তারা কেবল বিশ্বাসহীনই হয় না, তারা নিজেদের অন্তরকে এমনভাবে বদলে ফেলে যে শেষ পর্যন্ত পরিণতি হয়ে দাঁড়ায় আল্লাহর বিচার থেকে বঞ্চিত এক নিঃসঙ্গতা। এখানে কোনো নির্দিষ্ট কারণ-সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনা নির্ভরযোগ্যভাবে স্থির নয়; তবে আয়াতের ব্যাপ্তি সাধারণ—এটি সব যুগের সেইসব মানুষের জন্য, যারা দুনিয়াকে স্থায়ী ভেবে আখিরাতের ডাকে কান দেয় না। এ এক হৃদয়কাঁপানো সতর্কতা: ধর্ম যদি জীবনের কেন্দ্র না হয়, তবে জীবনই ধর্মকে গিলে ফেলবে।
দ্বীনকে খেলা বানানো মানে কেবল কিছু বিধান অমান্য করা নয়; এর মানে হৃদয়ের ভেতরে সত্যের গাম্ভীর্যকে হারিয়ে ফেলা। মানুষ তখন নামাজকে অভ্যাসে, ইবাদতকে সংস্কৃতিতে, নৈতিকতাকে সুবিধার মাপে, আর আখিরাতকে দূরের কোনো অবাস্তব কথায় নামিয়ে আনে। কুরআন যেন বলছে, এ রকম আত্মবিস্মৃতির শুরু হয় খুব নীরবে—একটি অবহেলায়, একটি হাস্যরসে, একটি ‘পরে দেখা যাবে’ ভেবে। কিন্তু এই তুচ্ছ মনে হওয়া শৈথিল্যই একদিন মানুষের পুরো অস্তিত্বকে খালি করে দেয়। যে হৃদয় সত্যের সামনে মাথা নত করতে শেখে না, সে ধীরে ধীরে নিজের ভেতরেই এমন এক অন্ধকার গড়ে তোলে, যেখানে আল্লাহর স্মরণও আর আগের মতো কাঁপায় না।
এই আয়াত আমাদের কাঁপিয়ে দেয়, কারণ এটি শুধু অতীতের কিছু অবাধ্য মানুষের কথা বলে না; এটি প্রতিটি যুগের সেই হৃদয়ের কথা বলে, যে হৃদয় ঈমানের বদলে বিনোদন বেছে নেয়, তাকওয়ার বদলে তাড়না বেছে নেয়, এবং আখিরাতের বদলে তাড়াহুড়ো করা দুনিয়াকে বেছে নেয়। মানুষের জীবন তখনই নিরাপদ, যখন সে স্মরণ রাখে—সে আল্লাহর কাছে যাবে, তার প্রতিটি অবহেলা, প্রতিটি অবজ্ঞা, প্রতিটি উপহাসের হিসাব হবে। আর যে দিনকে মানুষ ভুলে যায়, সে দিন একদিন মানুষকেই গিলে ফেলে। তাই কুরআনের এই সতর্কবাণী আমাদের জন্য শোকের মতো, আবার ডাকের মতোও—এখনও সময় আছে, হৃদয়কে জাগাও, দ্বীনকে সম্মান দাও, দুনিয়ার চকচকে আবরণ ভেদ করে চিরসত্যের দিকে ফিরে এসো।
কখনো মানুষ দ্বীনকে হৃদয়ের অগ্নি বানায় না; সে তাকে বানিয়ে ফেলে বাহ্যিক পরিচয়ের সাজ, কথার অলংকার, আর সুবিধামতো ব্যবহারের বস্তু। তখন নামাজ থাকে, কিন্তু হৃদয়ে নত হওয়ার স্বাদ থাকে না; কুরআন থাকে, কিন্তু কুরআনের ডাক শোনা হয় না; আখিরাতের কথা থাকে, কিন্তু তা স্পর্শ করে না। এই আয়াতে সেই আত্মবিস্মৃত সমাজের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে, যারা দ্বীনকে তামাশা ও খেলা বানিয়ে নিয়েছিল, আর দুনিয়ার ঝলক তাদের চোখে পর্দা টেনে দিয়েছিল। দুনিয়া এমন এক মোহ, যা সত্যকে মিথ্যা করে দেখায় না—বরং মানুষের ভেতরের সত্য দেখার শক্তিটাই নিঃশব্দে ক্ষয় করে দেয়। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে এমন এক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যায়, যেখানে আল্লাহর আদেশ বোঝা যায়, কিন্তু মানা যায় না; হিদায়াত শোনা যায়, কিন্তু অন্তরে নড়া দেয় না।
তারপর আসে সেই ভীতিকর বাক্য: আজ আমি তাদের ভুলে যাব, যেমন তারা এই দিনের সাক্ষাৎকে ভুলে গিয়েছিল। এটি আল্লাহর স্মৃতি হারানোর মানবিক প্রতিফল। আল্লাহ কোনো কিছু ভুলে যান—এ কথা নয়; বরং এটা এমন এক ন্যায়বিচারের ভাষা, যেখানে বান্দা নিজেই যে সত্যকে অগ্রাহ্য করেছে, সেই অগ্রাহ্যের ছায়াই তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। যে হৃদয় আখিরাতকে অবহেলা করে, সে নিজের হাতেই নিজের জন্য শূন্যতা তৈরি করে। যে আল্লাহর আয়াতের সামনে চোখ বুজে থাকে, কিয়ামতের দিন তার জন্য নূরের দরজা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। তখন দুনিয়ার সব ব্যস্ততা, সব বাহানা, সব আত্মপ্রবঞ্চনা মুছে যায়; অবশিষ্ট থাকে শুধু সেই জীবন, যার হিসাব কখনোই থামেনি।
তাই এই আয়াত ভয় জাগায়, আবার জাগরণের পথও দেখায়। ভয় এ জন্য যে, দ্বীনকে হালকা করে দেখার পরিণাম কত নির্মম হতে পারে; আশা এ জন্য যে, আজও দরজা খোলা আছে, আজও ফিরে আসা সম্ভব, আজও আত্মাকে ধুয়ে নেওয়া যায় তওবা ও তাকওয়ার অশ্রুতে। মুমিনের জীবন এমন হতে পারে না, যেখানে আখিরাত কেবল কথার বিষয়; আখিরাত হতে হবে হৃদয়ের দিগন্ত, প্রতিদিনের জবাবদিহি, নিঃশব্দ সাক্ষী। যখন মানুষ মনে রাখে যে একদিন সে আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে, তখন দুনিয়ার মোহ আপন শক্তি হারায়। আর যে এই স্মরণ বুকে বাঁচিয়ে রাখে, সে তামাশার জীবন থেকে মুক্ত হয়; সে তার দ্বীনকে খেলার বস্তু নয়, রুহের মুক্তি হিসেবে গ্রহণ করে।
আজকের এই আয়াত আমাদের সামনে এক ভয়ংকর দরজা খুলে দেয়—হৃদয় যদি অবহেলায় জমে যায়, ঈমান যদি অভ্যাসে শুকিয়ে যায়, তবে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের রবের স্মৃতি থেকে সরে যায়। আর তখন শাস্তির সবচেয়ে তীব্র রূপ হয় এই যে, আল্লাহ তাকে তার অবস্থার সঙ্গে ছেড়ে দেন; করুণার ছায়া থেকে বঞ্চিত করে দেন, যেমন সে নিজেই আখিরাতের সাক্ষাৎকে ভুলে গিয়েছিল। এ এমন এক পরিণাম, যেখানে কান্না দেরি করে আসে, তওবা দেরি করে আসে, আর আফসোসও কোনো পথ খুঁজে পায় না।
তাই আজই হৃদয়ের ভেতর থেকে জাগতে হবে। দ্বীনকে শুধু নাম, পরিচয়, রেওয়াজ, বা বাহ্যিক সম্মানের আবরণে রেখে দিলে চলবে না; তাকে বাঁচাতে হবে ভেতরের তাকওয়ায়, লজ্জায়, জবাবদিহির অনুভবে। দুনিয়া থাকবে, কিন্তু দুনিয়া যেন আমাদের প্রতারণা না করে। জীবন থাকবে, কিন্তু জীবন যেন আমাদের রবের দেখা ভুলিয়ে না দেয়। যে মানুষ আজ বিনয়ের সঙ্গে নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে—আমি কি আখিরাতকে স্মরণ করছি, নাকি প্রতিদিন একটু একটু করে ভুলে যাচ্ছি?—সে-ই আল্লাহর রহমতের দরজায় ফিরে আসতে পারে। আর এই ফেরা-ই একমাত্র সুরক্ষা, একমাত্র শান্তি, একমাত্র নাজাত।