কখনো কখনো মানুষ পাপকে পাপ বলে মানে না; সে তাকে অভ্যাস বলে, সংস্কৃতি বলে, বংশপরম্পরা বলে, এমনকি ধর্মের রঙও লাগিয়ে দেয়। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা সেই পুরোনো কিন্তু ভয়ংকর আত্মপ্রবঞ্চনাকে উন্মোচন করেছেন: যখন তারা কোনো অশ্লীল, নিকৃষ্ট বা প্রকাশ্য মন্দ কাজ করে, তখন বলে, আমরা তো আমাদের বাপ-দাদাকেও এভাবেই করতে দেখেছি। আরও এক ধাপ এগিয়ে তারা আল্লাহর নামে মিথ্যা আরোপ করে বলে, আল্লাহই নাকি এমন করতে বলেছেন। কুরআন এই অন্ধকারকে কাঁপিয়ে দিয়ে ঘোষণা করে: আল্লাহ মন্দ কাজের আদেশ দেন না। যে সত্তা পবিত্র, যিনি ন্যায় ও শুদ্ধতার উৎস, তাঁর দিকে ফাহশা বা অশ্লীলতার দায় আরোপ করা—এ কেমন ভয়ানক দুঃসাহস!

এই বাক্য শুধু একটি নির্দিষ্ট গোনাহের প্রতিবাদ নয়; এটি মানুষের ভিতরের সেই প্রবণতার প্রতিবাদ, যেখানে মিথ্যা উত্তরাধিকারকে সত্যের আসনে বসানো হয়। আয়াতের প্রসঙ্গ সামগ্রিকভাবে মক্কার মুশরিকদের ধর্মীয় ও সামাজিক বিকৃতি, এবং মানুষের সেই চিরাচরিত দুর্বলতা—অন্ধ অনুকরণ—এর বিরুদ্ধে কথা বলে। কুরআন বারবার শেখায়, কোনো প্রথা শুধু পুরোনো বলেই পবিত্র হয়ে যায় না; কোনো রীতিকে বহু বছর ধরে চালু রাখা মানেই তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে যাওয়া নয়। সত্যের মানদণ্ড বাপ-দাদার স্মৃতি নয়, ওহির আলো।

এখানে একটি ভয়ংকর নৈতিক প্রশ্নও তোলা হয়েছে: তোমরা কি এমন কথা আল্লাহর প্রতি আরোপ কর, যা তোমরা জানই না? অর্থাৎ, জ্ঞানহীন দাবি, অনুমাননির্ভর ধর্ম, আর আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য গড়া মিথ্যা—এসব আল্লাহর সামনে কত লজ্জার! এই আয়াত অন্তরে তাকওয়ার কাঁটা বসিয়ে দেয়, কারণ মানুষ যখন নিজের প্রবৃত্তিকে জায়েয করার জন্য আল্লাহর নাম ব্যবহার করে, তখন সে শুধু পাপই করে না, বরং পাপকে ধর্মের মুখোশ পরায়। আল-আরাফের এই শিক্ষা আমাদের শিখায়: মুমিন সেই, যে বংশ, পরিবেশ, জনমত বা সামাজিক চাপের আগে আল্লাহর হুকুমকে চিনে; যে নিজের ত্রুটি স্বীকার করতে ভয় পায় না, কিন্তু আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করতে সর্বাধিক ভয় পায়।

মানুষের অন্তর কত বিচিত্রভাবে সত্যকে এড়িয়ে যায়! সে কখনো নিজের প্রবৃত্তির কাছে হার মানে, কখনো সমাজের কাছে, কখনো আবার বাপ-দাদার ছায়াকে সত্যের বিকল্প বানিয়ে ফেলে। এই আয়াতে সেই আত্মপ্রবঞ্চনার মুখোশ ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। পাপ যখন প্রথা হয়ে যায়, তখন মানুষ তাকে আর পাপ বলে দেখে না; তাকে দেখে অভ্যাস হিসেবে, পরিচয় হিসেবে, উত্তরাধিকার হিসেবে। কিন্তু উত্তরাধিকার কি আল্লাহর সামনে দলিল হতে পারে? যে কাজ আলোর সামনে দাঁড়াতে পারে না, সে কাজকে অন্ধ ইতিহাসের কাঁধে তুলে দিলে সত্য বদলায় না। বংশের স্মৃতি অনেক কিছু বহন করতে পারে, কিন্তু হিদায়াতের ওজন বহন করতে পারে না।

এখানে কুরআন যেন অন্তরের সবচেয়ে গভীর অজুহাতটিকেই বিচারাসনে দাঁড় করিয়েছে। মানুষ শুধু মন্দ কাজ করে না, কখনো কখনো সেই মন্দকে আল্লাহর নামে বৈধও করে নিতে চায়। এর চেয়ে বড় দুঃসাহস আর কী হতে পারে—নিজের নফসের ইচ্ছাকে আসমানি সিলমোহর দেওয়ার চেষ্টা! অথচ আল্লাহ পবিত্র, ন্যায়বান, এবং কল্যাণের উৎস; তাঁর পক্ষ থেকে ফাহশা, অশ্লীলতা ও বিকৃতির আদেশ আসতে পারে না। তাই এ আয়াত আমাদের শেখায়, ঈমান মানে শুধু কিছু কথা মুখে উচ্চারণ করা নয়; ঈমান মানে মিথ্যা অজুহাত ভেঙে দেওয়ার সাহস, সত্যের সামনে নত হওয়ার সততা, আর এই স্বীকারোক্তি যে হিদায়াতের মানদণ্ড মানুষ নয়—ওহি। যে হৃদয় নিজের রেওয়াজকে আল্লাহর হুকুমের উপরে বসায়, সে আসলে সৃষ্টির অনুসরণে স্রষ্টাকে আড়াল করে দেয়। আর যে হৃদয় কুরআনের আলোয় নিজের পুরনো পথকে মেপে দেখে, তার জন্য এই আয়াত এক জাগরণ: যা মন্দ, তা যতই পুরোনো হোক, ততই মন্দ; আর যা সত্য, তা যতই অপরিচিত হোক, ততই নাজাতের দরজা।
এই আয়াতে মানুষের অন্তরের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিকৃতি ধরা পড়ে: যখন সে নিজের পাপকে শুধু পাপ হিসেবে বহন করতে পারে না, তখন তাকে বাপ-দাদার উত্তরাধিকার বানিয়ে ফেলে। যেন বহু বছর ধরে চলে আসা কোনো কাজই পবিত্রতার সনদ হয়ে যায়। অথচ আল্লাহ তাআলা মানুষকে স্মৃতি দিয়ে শুধু অতীত আঁকড়ে ধরার জন্য দেননি; দিয়েছেন বাছাই করার বোধ, সত্যকে চিনে নেওয়ার ক্ষমতা, আর ওহির আলোয় অন্ধতাকে ছিন্ন করার সাহস। যে সমাজে প্রথা প্রশ্নহীন, সেখানে অন্যায় দ্রুত ধর্মের মুখোশ পরে নেয়; আর তখন নোংরাই শালীনতার ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। কুরআন সেই মুখোশ টেনে ছিঁড়ে দেয়, যেন মানুষ বুঝতে পারে—পরিচিত হওয়া আর সঠিক হওয়া এক জিনিস নয়।

আল্লাহ মন্দের আদেশ দেন না—এই ঘোষণাটি শুধু একটি বাক্য নয়, এটি ঈমানের মানদণ্ড। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, ফিতরাহকে পবিত্র রেখেছেন, ন্যায়ের ভারসাম্য স্থাপন করেছেন, তাঁর দিকে ফাহশা বা অশ্লীলতার দায় আরোপ করা মানে নিজের বিবেককে অস্বীকার করা। এ আয়াত আমাদের ভেতরে ভয় জাগায়, কারণ পাপ শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; কখনো কখনো তা আল্লাহর নামে মিথ্যা বলার দুঃসাহস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আর একই সঙ্গে আশা জাগায়, কারণ আল্লাহ আমাদের অন্ধ বংশানুক্রমে বন্দি করে রাখেননি; তিনি সত্যকে জানার পথ খোলা রেখেছেন। তাই যে অন্তর এখনো জেগে আছে, সে যেন আজই নিজের উত্তরাধিকার, নিজের প্রবণতা, নিজের অভ্যাস—সবকিছুকে ওহির সামনে দাঁড় করায়। আল্লাহর দিকে ফিরে আসা মানে শুধু গুনাহ ছেড়ে দেওয়া নয়; মিথ্যার সঙ্গে ভাঙা, আর সত্যের কাছে নত হওয়া।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষ আর অন্যকে নয়, আগে নিজেকেই প্রশ্ন করে: আমি কি কখনো ভুলকে উত্তরাধিকার বানিয়ে নিয়েছি? আমি কি কখনো এমন কাজকে স্বাভাবিক বলেছি, শুধু তাই বলে যে এটাই চারপাশের চল, এটাই বাপ-দাদার পথ, এটাই সমাজের নিয়ম? কুরআন এখানে শুধু একটি মন্দ কাজের প্রতিবাদ করছে না; সে মানুষের ভিতরের সেই অন্ধতার মুখোশ ছিঁড়ে দিচ্ছে, যেখানে সত্যকে সংখ্যায় মাপা হয়, আর পাপকে পরিচয়ের অংশ বানানো হয়। কিন্তু আল্লাহর তরফ থেকে আসা আলো কখনো মিথ্যার সাথে আপস করে না। তিনি পবিত্র, তাঁর নির্দেশ পবিত্রতার দিকে ডাকে; আর যে জিনিস ফাহশা, যে জিনিস অন্তরকে কলুষিত করে, তা তাঁর আদেশ হতে পারে না।

কত ভয়ংকর এক অবস্থা, যখন মানুষ নিজের অপরাধকে শুধু ঢেকে রাখে না, বরং আল্লাহর নামে তা সাজিয়ে নেয়। তখন পাপ আর ব্যক্তিগত থাকে না, সে হয়ে ওঠে এক গভীর আত্মপ্রবঞ্চনা, এক ধর্মীয় মিথ্যার আবরণে মোড়ানো গোনাহ। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়, হিদায়াত মানে শুধু জানা নয়, জেগে ওঠা; শুধু উত্তরাধিকার পাওয়া নয়, পরীক্ষা করা; শুধু চলতি পথ ধরে হাঁটা নয়, ওহির সামনে মাথা নত করা। যে হৃদয় সত্য চায়, সে বাপ-দাদার নামের আড়ালে পাপকে নিরাপদ মনে করে না; সে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অন্তরকে শুদ্ধ করতে শেখে।

আজ আমাদেরও প্রয়োজন সেই কম্পন, সেই তওবার ভেতরকার নীরব কান্না। কারণ অনেক ভুল এমনভাবে আমাদের ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে যে আমরা তাকে আর ভুল বলি না। কিন্তু কুরআন আজও জাগিয়ে তোলে: আল্লাহ মন্দের আদেশ দেন না। তাই যে বান্দা বাঁচতে চায়, সে প্রথার নয়, সত্যের পক্ষ নেয়; আত্মপক্ষসমর্থনের নয়, ইস্তিগফারের দরজায় আসে; অহংকারের নয়, তাকওয়ার পথে ফিরে যায়। হয়তো এই ফিরে আসার ভেতরেই আছে বাঁচার একমাত্র দরজা—যেদিন আমরা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করা বন্ধ করব, সেদিনই আমাদের অন্তর সত্যের আলো পেতে শুরু করবে।