মানুষ কত কিছুই জানতে চায়—কিন্তু কিছু সত্য আছে, যা জানার নয়; বরং যার সামনে মাথা নত করার। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা আমাদের সামনে কেয়ামতের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। প্রশ্ন আসে, কেয়ামত কখন? কোথায়? কীভাবে? আর জবাব আসে এক অপার মহিমায়: এর জ্ঞান কেবল আমার রবের কাছেই। আসমান-জমিনের সমস্ত ভার, সমস্ত রহস্য, সমস্ত পর্দা—সবকিছুই তাঁর ইলমের অধীন। মানুষের জিজ্ঞাসা যতই তীব্র হোক, সময়ের চাবি মানুষের হাতে নয়। কেয়ামত এমন এক বাস্তবতা, যা মানুষের কল্পনারও ঊর্ধ্বে, আর তার নির্ধারিত মুহূর্ত মানুষের অনুসন্ধানে ধরা দেয় না; বরং যখন আল্লাহ চাইবেন, তখনই তা আচমকা এসে উপস্থিত হবে।
এই কথায় একদিকে আছে ভয়, অন্যদিকে আছে শান্তি। ভয় এই জন্য যে, জীবন কোনো দীর্ঘ প্রতিশ্রুতি নয়; প্রতিটি শ্বাসই আখিরাতের দিকে ছুটে চলা এক যাত্রা। আর শান্তি এই জন্য যে, অদৃশ্যের ভার আমাদের কাঁধে দেওয়া হয়নি। আমাদের দায়িত্ব কেয়ামতের তারিখ বের করা নয়, বরং কেয়ামতের জন্য প্রস্তুত হওয়া। এ আয়াতের ভিতর দিয়ে আল্লাহ যেন মানুষের অহংকার ভেঙে দেন—যে মানুষ মনে করে, সে সবকিছু জানবে, সবকিছু বুঝবে, ভবিষ্যতের পর্দাও সরিয়ে ফেলবে। অথচ ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সত্যটাই তার অজানা। এ অজ্ঞতা আমাদের অপমান নয়; বরং আমাদের দাসত্বের স্বীকৃতি।
এই সূরার সামগ্রিক ধারা—আদম ও ইবলিসের কাহিনি, নবীদের আহ্বান, জাতিগুলোর পতন, হিদায়াত ও তাকওয়ার ডাক—সব মিলিয়ে আমাদের শেখায় যে ইতিহাসের প্রতিটি পতনই ছিল সতর্কবার্তা। জাতিরা আসমানি সংবাদকে হেলাফেলা করেছে, সত্যের ডাকে দেরি করেছে, আর শেষ পর্যন্ত হঠাৎই ধরা পড়েছে আল্লাহর ফয়সালার কাছে। তাই এখানে কেয়ামতকে অজানা রাখা কোনো তথ্যের অভাব নয়; বরং বান্দাকে জাগিয়ে তোলার এক গভীর রহমত। যে দিনটির সময় জানা নেই, সেই দিনটির জন্যই প্রতিটি দিনকে মূল্যবান করতে হবে। যে আখিরাত হঠাৎ আসবে, তার জন্য অন্তরকে প্রস্তুত রাখতে হবে। কারণ অধিকাংশ মানুষই জানে না—তারা শুধু সময়ের হিসাব করে, কিন্তু নিজের শেষের হিসাব করে না।
মানুষের জিজ্ঞাসা অনেক সময় জ্ঞান চায়, কিন্তু জ্ঞান চাওয়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকে নিয়ন্ত্রণের বাসনা। কেয়ামতের সময় জানতে চাওয়া যেন সেই পুরোনো মানবঅহংকারেরই আরেক রূপ—যেন অদৃশ্যও মানুষের মাপে ধরা পড়তে হবে। অথচ আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে আমাদের শিখিয়ে দিলেন, কিছু সত্য আছে যা জানা নয়, মানা; কিছু দরজা আছে যা খোলার জন্য মানুষের জন্ম হয়নি, শুধু নত হওয়ার জন্যই সৃষ্টি হয়েছে। কেয়ামতের ইলম একমাত্র তাঁরই কাছে—এ ঘোষণা মানুষের সীমা স্মরণ করিয়ে দেয়, আর একই সঙ্গে হৃদয়কে মুক্ত করে দেয় সেই তুচ্ছ কৌতূহল থেকে, যা শেষ পর্যন্ত আত্মাকে প্রস্তুত করার বদলে বিভ্রান্ত করে।
আরেকটি গভীর শিক্ষা হলো, এই জ্ঞান না জানা আমাদের অপমান নয়; বরং আল্লাহর হিকমতের অংশ। তিনি সবকিছু মানুষের জানার জন্য খোলেন না, কারণ মানুষ জানলে অনেক সময় অহংকার করে, আর না জানলে বিনয় শেখে। কেয়ামতের অজানা সময় আমাদের অন্তরে এক স্থায়ী প্রস্তুতি জাগিয়ে রাখে—যেন আমরা প্রতিদিন নিজেকে জিজ্ঞেস করি, আজ যদি সেই হঠাৎ আগমন এসে পড়ে, তবে আমার আমল, আমার তাওবা, আমার অন্তর কী বলে উঠবে? এই প্রশ্নই ঈমানকে জাগিয়ে তোলে। যে ব্যক্তি কেয়ামতের তারিখ জানে না, কিন্তু কেয়ামতের জন্য তৈরি থাকে, সে-ই আসলে সচেতন। আর যে ব্যক্তি তারিখের খবর খুঁজে বেড়ায় কিন্তু আত্মার হিসাব করে না, সে অন্ধ। আল্লাহ আমাদের সেই অন্তর দান করুন, যে অন্তর অজানার সামনে ভেঙে পড়ে, আর ভেঙে পড়েই তাঁর দিকে ফিরে যায়।
মানুষের জিজ্ঞাসা কখনো কখনো কৌতূহল হয়ে ওঠে, আর কখনো হয়ে ওঠে গাফিলতির আরেক নাম। কেয়ামতের সময় জানতে চাওয়া যেন আমাদেরই এক গভীর অসুখ প্রকাশ করে—আমরা জানতে চাই, কিন্তু বদলাতে চাই না; শুনতে চাই, কিন্তু প্রস্তুত হতে চাই না। আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে আমাদের সামনে এমন এক সত্য রাখেন, যা মানুষের সমস্ত হিসাব-নিকাশকে ছোট করে দেয়: এর জ্ঞান একমাত্র তাঁরই কাছে। আসমান ও যমীনের সব ভার যে রব বহন করেন, তাঁর সামনে মানুষের অক্ষমতা লুকোবার কিছু নেই। তাই এ প্রশ্নের জবাব শুধু তথ্য নয়, বরং আত্মসমর্পণের আহ্বান: সীমা মেনে নাও, অহংকার ভাঙো, নিজের অন্তরকে জাগাও।
কেয়ামত হঠাৎ আসবে—এই বাক্যে আছে ভয়ের কাঁপন, আবার আছে জাগরণের ডাক। হঠাৎ আগমন মানে এই নয় যে আমরা অসহায়ভাবে আতঙ্কে কুঁকড়ে থাকব; বরং এই যে, প্রতিটি দিনই আমাদের জন্য সুযোগ, প্রতিটি সকালই তওবার দরজা। মানুষ সমাজে এমনভাবে বাঁচে যেন মৃত্যু অনেক দূরের খবর, অথচ এই আয়াত স্মরণ করিয়ে দেয়—অজানার পর্দার আড়াল থেকে একদিন সব কিছু প্রকাশিত হবে, এবং তখন কোনো দেরি, কোনো অজুহাত, কোনো অভিনয় কাজে আসবে না। যারা পৃথিবীর চাকচিক্যে বিভোর, যারা ন্যায়-অন্যায়ের হিসাব ভুলে যায়, যারা নিজের নফসকে কথার রাজ্যে সন্তুষ্ট রাখে—এই আয়াত তাদের অন্তরে কাঁপন ধরায়। কারণ আখিরাত কোনো দর্শনীয় ধারণা নয়; তা এমন এক মিলনমুখর সত্য, যেখানে বান্দা ফিরে যাবে তার রবের দিকে, একাকী, নিঃস্ব, কিন্তু তার আমলই হবে তার সঙ্গী।
আর এই না-জানার ভেতরেই ইমানের সৌন্দর্য। আল্লাহ আমাদের সব গোপন খুলে দেননি, কারণ মানুষকে আল্লাহর বান্দা হতে হয়, আল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। আমাদের দায়িত্ব কেয়ামতের ঘড়ি গণনা করা নয়; আমাদের দায়িত্ব নিজের হৃদয়ের ঘড়ি ঠিক করা। আজ যদি অন্তর নরম হয়, যদি চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, যদি জিহ্বা তওবায় ফিরে আসে, যদি লেনদেনে ইনসাফ আসে, যদি পরিবারে রহম আসে, যদি গুনাহের পথে পা থেমে যায়—তবে বুঝতে হবে, কেয়ামতের অজানা সময় আমাদের জন্য বরকতের সময় হয়ে উঠতে পারে। এই আয়াত আমাদের শেখায়, আল্লাহর জ্ঞানের সামনে নত হওয়াই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা, আর আখিরাতের জন্য বাঁচাই প্রকৃত সাফল্য।
মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল বোধহয় এই—সে জানতে চায়, কিন্তু বদলাতে চায় না। কেয়ামতের সময় জানার আগ্রহে কত প্রশ্ন, কত কৌতূহল; অথচ নিজের অন্তরের কেয়ামত, নিজের গুনাহের কেয়ামত, নিজের মৃত্যু—এসবের জন্য প্রস্তুতির তাগিদ কত কম। আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে যেন মানুষের হাতে থাকা ভ্রান্ত অহংকারের সব কাগজপত্র ছিঁড়ে দেন। তিনি জানিয়ে দেন, অদৃশ্যের চাবি মানুষের কাছে নয়। যে রব আসমান-জমিনকে ধারণ করে আছেন, তাঁর কাছে গোপন নেই কিছুই; আর মানুষের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে জানে—একদিন হঠাৎ করেই সব শেষ হয়ে যাবে, হিসাব শুরু হবে, আর তখন আর কোনো অবকাশ থাকবে না।
এই অজ্ঞতার মধ্যেই মানুষের জন্য রক্ষা আছে। কারণ, সময় জানা থাকলে অনেকেই প্রস্তুতি নয়, কেবল অপেক্ষা করত; তাও হয়তো গাফিলভাবে। কিন্তু সময় গোপন রাখার মধ্যে আছে এক অমোঘ জাগরণ—প্রতিটি সকালকে শেষ সকাল ভাবতে শেখা, প্রতিটি সিজদাকে শেষ সুযোগ ভাবতে শেখা, প্রতিটি তওবাকে জরুরি মনে করা। কেয়ামত যখন আসবে, তা আসবে আচমকা; আর যে হৃদয় আল্লাহর দিকে ফিরে আছে, তার জন্য সেই হঠাৎ আগমন হবে ভয় ও শান্তির একসঙ্গে দোলা। আজ তাই প্রশ্ন এই নয় যে, কেয়ামত কবে—প্রশ্ন এই, আমি যদি আজই তাঁর সামনে দাঁড়াই, আমার আমল কি আমাকে লজ্জা দেবে, নাকি রহমতের আশা দেবে? এ প্রশ্নই হৃদয়কে নরম করে, আত্মাকে ভেঙে দেয়, আর মানুষকে আবার তার রবের দরজায় ফিরিয়ে আনে।