মানুষের ইতিহাসের শুরু কেবল মাটির শরীর দিয়ে নয়, বরং এক গভীর রব-চেনা সাক্ষ্য দিয়ে। সূরা আল-আরাফের এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা বানী আদমের অন্তর্গত সেই আদিম অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করান—যেখানে মানুষকে তার নিজের সত্তার সামনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, আমি কি তোমাদের রব নই? আর মানুষের অন্তর থেকে উঠে এসেছে এক স্বতঃস্ফূর্ত, অবিনাশী স্বীকৃতি: হ্যাঁ, অবশ্যই। যেন মানুষের অস্তিত্বের সবচেয়ে গভীরে এক সত্য লেখা ছিল, যা গাফিলতির ধুলায় আচ্ছন্ন হলেও মুছে যায় না। এই আয়াত আমাদের জানায়, ঈমান মানুষের ওপর বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো অচেনা শব্দ নয়; তা তার ফিতরাতের ভিতরে গাঁথা একটি পুরোনো প্রতিধ্বনি।
এই ঘোষণার উদ্দেশ্য কেয়ামতের দিনে অজুহাতের দরজা বন্ধ করে দেওয়া। মানুষ যেন বলতে না পারে, আমরা তো জানতাম না, আমাদের কাছে তো কোনো সাক্ষ্য আসেনি, আমরা রবকে ভুলে গিয়েছিলাম বলেই পথভ্রষ্ট হয়েছি। আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরে নিজের পরিচয়ের সাক্ষ্য স্থাপন করেছেন, আর সেই সাক্ষ্যই হিদায়াতের ভিত্তি। তাওহিদ এখানে কেবল একটি আকিদাগত বক্তব্য নয়; এটি মানুষকে তার আসল ঠিকানায় ফিরিয়ে আনার আহ্বান। কারণ বানী আদম যত দূরেই ছড়িয়ে পড়ুক, জাতি-কাল-ভূগোলের যত পরিবর্তনই আসুক, তাদের রূহের গভীরে একটাই প্রশ্ন জেগে থাকে—আমি কার বান্দা? আমি কার সামনে জবাবদিহির মুখোমুখি হব? এই প্রশ্নই গাফিলতিকে ভেঙে দেয়, আর হৃদয়কে আখিরাতমুখী করে।
এই আয়াতের ব্যাপক পরিসর পুরো সূরার সুরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আদম-ইবলিসের দ্বন্দ্ব, নবীদের আহ্বান, জাতিসমূহের পতন, হেদায়াত গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যান—সবকিছুর কেন্দ্রে আছে মানুষের এই মৌলিক সত্যভ্রষ্টতা ও সত্যফেরা। নির্ভরযোগ্যভাবে নির্দিষ্ট কোনো একক ঘটনা-নির্ভর শানে নুযুল এ আয়াতের জন্য প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং এটি মানবজাতির সামগ্রিক অবস্থার কথা বলে, আল্লাহর চিরন্তন দস্তুরকে তুলে ধরে। সমাজ, পরিবার, আইন, দায়িত্ব, এবং কেয়ামতের জবাবদিহি—সবখানেই এই আয়াতের ছায়া বিস্তৃত। মানুষ যখন নিজের রবকে ভুলে যায়, তখন তার ভেতরে নেমে আসে শূন্যতা; আর যখন সে সেই প্রাচীন সাক্ষ্যকে জাগিয়ে তোলে, তখন হৃদয়ে ফিরে আসে তাকওয়া, বিনয়, এবং আখিরাতের আলো।
মানুষের ভেতরে যে সাক্ষ্য একবার জাগ্রত হয়, তা কেবল স্মৃতির কথা নয়; তা অস্তিত্বের প্রশ্ন। আল্লাহ তাআলা বানী আদমকে তাদের নিজের সত্তার সামনে দাঁড় করিয়ে যে প্রশ্ন করেছেন, তা আজও প্রতিটি হৃদয়ের গভীরে নীরবে বাজে—আমি কি তোমাদের রব নই? এই প্রশ্নের সামনে মানুষের সব অহংকার, সব কৃত্রিম পরিচয়, সব গাঢ় অজুহাত মুহূর্তেই নত হয়ে যায়। কারণ মানুষ যতই দূরে সরে যাক, তার ফিতরাতের মাটিতে তাওহিদের বীজ রয়ে যায়। গাফিলতি তাকে ঢেকে ফেলে, কিন্তু মুছে ফেলতে পারে না; পাপ তাকে ভারী করে, কিন্তু সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ করতে পারে না।
এই কারণেই তাওহিদ কোনো শুষ্ক তত্ত্ব নয়; তা হৃদয়ের ঘরে ফিরে আসার নাম। যে অন্তর একবার এ সাক্ষ্যের সামনে কেঁপে ওঠে, সে আর মিথ্যার জাঁকজমককে সত্য বলে মানতে পারে না। দুনিয়ার বিভ্রান্তি, নফসের ডাক, শয়তানের ফিসফিস—সবই তখন ক্ষণস্থায়ী পর্দা মনে হয়। আর বানী আদমের এই আদিম অঙ্গীকার আমাদের সামনে এক গভীর বাস্তবতা রেখে যায়: মানুষ ভুলে যাওয়ার প্রাণী, কিন্তু তার ভুলে যাওয়ার মাঝেও সত্যের আলো পুরোপুরি নিভে না। তাই মুমিনের কাজ হলো সেই অন্তর্গত সাক্ষ্যকে আবার জাগানো, গাফিলতির আস্তরণ সরানো, এবং লজ্জা ও ভালোবাসা নিয়ে রবের দিকে ফিরে বলা—হ্যাঁ, আপনিই আমাদের রব, আর আমরা আপনারই বান্দা।
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষের সবচেয়ে বড় বিস্মৃতি তার তথ্যের অভাব নয়, তার আত্মবিস্মৃতি। সে নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা রব-চেনা সত্যকে চাপা দেয়, তারপর দুনিয়ার কোলাহলে বলে, আমি কিছুই জানতাম না। অথচ আল্লাহ তাআলা তো আমাদের অন্তরের গভীরে এমন এক সাক্ষ্য রেখে দিয়েছেন, যা ভাঙা যায়, ঢেকে রাখা যায়, কিন্তু মুছে ফেলা যায় না। তাই গাফিলতি কেবল মনোযোগের ঘাটতি নয়; তা এক নীরব বিদ্রোহ, যেখানে বান্দা নিজের রবকে ভুলে গিয়ে নিজের অহংকারকে সত্য বলে মেনে নেয়। এই সত্যের সামনে দাঁড়ালে হৃদয় কেঁপে ওঠে—আমি কি আমারই অন্তরের সেই স্বীকারোক্তিকে চাপা দিয়ে বেঁচে আছি?
আল্লাহর প্রশ্ন, আমি কি তোমাদের রব নই, আসলে কেবল একটি স্মৃতি নয়; এটি প্রতিটি যুগের মানুষের বিবেকের দরজায় ধাক্কা। আদমের সন্তানদের জীবনে যত নবী এসেছেন, যত আয়াত নাজিল হয়েছে, যত হুঁশিয়ারি এসেছে, সবই যেন সেই আদিম অঙ্গীকারকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান। মানবসমাজ যখন ন্যায় থেকে সরে যায়, যখন সত্যের বদলে প্রবৃত্তি নেতৃত্ব নেয়, যখন মানুষ মানুষকে ভুলে গিয়ে কেবল নিজের স্বার্থের উপাসক হয়ে ওঠে, তখন সে এই অঙ্গীকারের বিরুদ্ধেই দাঁড়ায়। তাই কেয়ামতের দিন অজুহাত আর টিকবে না; কারণ মানুষকে শুধু বিধানই দেওয়া হয়নি, তাকে নিজের ভেতরের সাক্ষ্যও দেওয়া হয়েছে।
এই আয়াতের ভেতরে ভয় আছে, কিন্তু তা ধ্বংসের ভয় নয়; তা জাগরণের ভয়। যে হৃদয় বুঝে যায় সে একাকী নয়, তার ওপর এক আদিম দায় লেখা আছে, সে আর হালকা হয়ে থাকতে পারে না। তাকওয়া তখন বাহ্যিক নিয়মের বোঝা থাকে না; তা হয়ে ওঠে নিজের সত্তার সঙ্গে সৎ থাকার নাম। আর যে আল্লাহর সামনে একদিন ‘বালা’ বলেছিল, সে আজ দুনিয়ার মায়ায় কীভাবে ‘না’ বলতে পারে? তাই এই আয়াত বান্দাকে ডাকে—ফিরে এসো, তোমার ভেতরেই তো রবের সাক্ষ্য জমা আছে। ধুলো সরাও, গাফিলতির পর্দা সরাও, হৃদয়ের কানে শোনা সেই প্রথম সুরটিকে আবার জাগাও: তিনি-ই আমার রব। এই স্বীকৃতি যত গভীরে নামে, আত্মা তত হালকা হয়, আর কেয়ামতের জন্য তত সত্যিকারের প্রস্তুতি শুরু হয়।
এই স্মরণ কেয়ামতের দিনের জন্যই শুধু নয়; আজকের দিনের জন্যও। কারণ প্রতিটি পাপ, প্রতিটি অবাধ্যতা, প্রতিটি অব্যাহত উদাসীনতা যেন সেই পুরোনো অঙ্গীকারের বিরুদ্ধে একেকটি ক্ষুদ্র বিদ্রোহ। যখন বান্দা রবকে ভুলে যায়, তখন সে কেবল বিধানই হারায় না, নিজের পরিচয়ও হারায়। আর যখন সে ফিরে আসে, তখন কোনো নতুন সত্য আবিষ্কার করে না—সে বরং নিজের হারানো সত্যের কাছে ফিরে আসে। তাই মুমিনের কান্না কখনো দুর্বলতার কান্না নয়; তা স্মৃতিতে ফেরা হৃদয়ের কান্না। সে জানে, একদিন সে বলেছিল, বালা, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি। আজ তার কাজ সেই সাক্ষ্যকে জীবনের ভেতর সত্য করে তোলা।
হে হৃদয়, আজ যদি তুমি ক্লান্ত হও, তবে এই আয়াতের সামনে নত হও। বলো, হে আল্লাহ, আমি তোমার সেই পুরোনো ডাকে সাড়া দিতে চাই; আমার গাফিলতির পর্দা সরিয়ে দাও, আমার ভেতরের সাক্ষ্যকে জাগিয়ে দাও, আমাকে এমন বান্দা বানাও, যে কেবল মুখে নয়, জীবনে বলে—তুমিই আমার রব। কারণ শেষ দিনের জবাবের আগে আজই যদি হৃদয় জেগে ওঠে, তবে সেটাই রহমত। আর যদি সে জাগে না, তবে মানুষ শুধু জাহান্নামের ভয়েই নয়, নিজের বিস্মৃত সত্তার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদবে।