কুরআন যখন বলে, “আর সে সময়ের কথা স্মরণ কর,” তখন তা শুধু একটি ইতিহাসের পাতা উল্টে দেয় না; মানুষের অন্তরে জমে থাকা বিস্মৃতি ভেঙে দেয়। আল-আরাফের এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের সেই ভয়ংকর দিনের কথা মনে করিয়ে দেন, যখন ফিরআউনের লোকেরা তাদেরকে নির্মম শাস্তির মধ্যে রেখেছিল—পুত্রসন্তানদের হত্যা করত, আর কন্যাদের জীবিত রাখত। এই আয়াতের শব্দগুলোতে আছে জুলুমের শীতল নিষ্ঠুরতা, আছে ক্ষমতার অহংকারে মানুষকে পিষে ফেলার নির্মমতা। কিন্তু একই সঙ্গে আছে এক মহান ঘোষণাও: এই বন্দিত্ব চূড়ান্ত নয়, এই অন্ধকারের মালিক ফিরআউন নয়, আল্লাহ।

এখানে নিছক একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করানো হচ্ছে না; একটি জাতির ওপর নেমে আসা জুলুমের ভেতর আল্লাহর রহমত কীভাবে কাজ করেছিল, সেটি হৃদয়ে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোনো নির্ভরযোগ্যভাবে নির্দিষ্ট একক sabab al-nuzul এখানে প্রসিদ্ধ নয়; তবে সূরার বৃহৎ ধারাবাহিকতায় বনী ইসরাইলের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ, নবীদের আহ্বান, আর অবাধ্য জাতিগুলোর পতনের স্মৃতি একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে আছে। অর্থাৎ, এই আয়াতের ভেতর দিয়ে কুরআন আমাদের শেখায়—ইতিহাস কেবল স্মরণ করার জন্য নয়, বরং হিদায়াতের আয়না হিসেবে দেখার জন্য। যে সমাজে নির্যাতন স্বাভাবিক হয়ে যায়, সেখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে মুক্তি একটি নিছক ঘটনা নয়; তা এক বিরাট নিআমত, এক কঠিন পরীক্ষা, এক জবাবদিহির দ্বার।

আর এ কারণেই আয়াতের শেষ বাক্যটি এত ভারী: “এতে তোমাদের প্রতি তোমাদের পরওয়ারদেগারের বিরাট পরীক্ষা রয়েছে।” নিপীড়ন যেমন পরীক্ষা, মুক্তিও তেমনি পরীক্ষা; কষ্ট যেমন যাচাই করে বান্দার সবর, তেমনি নাজাত যাচাই করে শোকর। মানুষ যখন দুঃখে থাকে, তখন সে সাহায্য চায়; কিন্তু সাহায্য পেয়ে সে কি রবকে ভুলে যায়, না কি তাঁর সামনে আরও বেশি নত হয়—সেটিই আসল প্রশ্ন। এই আয়াত আমাদের চোখের জলকে জাগিয়ে তোলে, আর অন্তরকে কাঁপিয়ে বলে: জুলুমের রাত যতই দীর্ঘ হোক, আল্লাহর দয়া তার চেয়ে বড়; তবে সেই দয়ার সাক্ষী হতে হলে ঈমানকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, তাকওয়াকে আঁকড়ে ধরতে হয়, আর আখিরাতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনকে পড়তে হয়।

ফিরআউনের লোকদের এই জুলুম কেবল ইতিহাসের কোনো বর্বর অধ্যায় নয়; এটি মানুষের ভেতরকার ক্ষমতাপূজার চরম রূপ। যখন শাসক নিজেকে রব ভাবতে শুরু করে, তখন সে মানুষকে সংখ্যা বানায়, সন্তানকে ভয় দেখানোর হাতিয়ার বানায়, মায়ের বুককে শূন্য করে দেয়, আর গোটা সমাজকে আতঙ্কের দীর্ঘ শ্বাসে বেঁধে ফেলে। কুরআন এই নিষ্ঠুরতার বিবরণ দেয়, যাতে আমরা বুঝতে পারি—জুলুম কখনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়; জুলুম হলো সেই অন্তর্গত রোগ, যেখানে অহংকার ঈমানকে হত্যা করে, আর ক্ষমতা দয়া-রহমতকে গলাটিপে মারে।

কিন্তু আয়াতের কেন্দ্রে শুধু নির্যাতনের স্মৃতি নয়, বরং উদ্ধারের ঘোষণা। আল্লাহ বলেন, আমি তোমাদেরকে মুক্ত করেছি। এ একটি বাক্যেই ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা বান্দার জন্য আকাশ খুলে যায়। কারণ মুক্তি কেবল শৃঙ্খল ভাঙা নয়; মুক্তি হলো এ কথাটি হৃদয়ে স্থির হয়ে যাওয়া যে, আমি কারো দাসত্বের জন্য সৃষ্টি হইনি—আমি আল্লাহর বান্দা। তাই ফেরাউনের হাত থেকে বাঁচানো মানে শুধু জীবন ফিরিয়ে দেওয়া নয়; মানে আকিদা ফিরিয়ে দেওয়া, মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া, ইতিহাসের সামনে মাথা সোজা করে দাঁড়ানোর শক্তি ফিরিয়ে দেওয়া। আল্লাহর সাহায্য যখন আসে, তখন সবচেয়ে শক্তিশালী কারাগারও কেবল একটি স্মৃতি হয়ে যায়।
আর শেষ বাক্যটি আমাদের বিবেকের দরজায় নাড়া দেয়: এতে তোমাদের জন্য তোমাদের রবের কাছ থেকে এক মহান পরীক্ষা রয়েছে। অর্থাৎ, নাজাতও পরীক্ষা; নিপীড়ন থেকে মুক্তিও ইমানের মাপ। মানুষ মুক্তি পেয়ে কৃতজ্ঞ হয় কি না, নতুন জীবনে আল্লাহকে স্মরণ করে কি না, নাকি নিরাপত্তা পেয়ে আবার গাফিল হয়ে পড়ে—এই প্রশ্নই আসল। অনেক সময় দুঃখের ভেতর আমরা দোয়া করি, আর সুখের ভেতর ভুলে যাই; বিপদের মধ্যে আমরা আল্লাহকে ডাকি, আর মুক্তির পর নিজেদের শক্তি বলে দাবি করি। তাই এই আয়াত শুধু বনী ইসরাইলের কাহিনি নয়, আমাদের অন্তরের আয়না। আল্লাহ কখনো জুলুমকে স্থায়ী করেন না, আবার মুক্তিকেও দায়িত্বহীন আনন্দে পরিণত হতে দেন না; তিনি বান্দাকে পরীক্ষা করেন, যেন সত্যিকারের কৃতজ্ঞতা, তাকওয়া, এবং আখিরাতমুখী জীবন প্রকাশ পায়।

কুরআন এখানে আমাদের সামনে শুধু একটি অতীতের দৃশ্য তুলে ধরে না; এটি মানুষের সমাজ, ক্ষমতার মানচিত্র, আর জুলুমের মনস্তত্ত্বকে উন্মোচন করে। ফিরআউনের লোকদের নিষ্ঠুরতা এমন ছিল না যে তারা কেবল শাস্তি দিত; তারা এক জাতির ভবিষ্যৎকে আঘাত করত, জন্মের অধিকারকে কেড়ে নিত, মায়ের কোলকে শোকের আগুনে পুড়িয়ে দিত। কুরআন এই স্মৃতি জাগিয়ে দিয়ে যেন বলছে: যখন শাসন আল্লাহভীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন ক্ষমতা মানুষকে মানুষ রাখে না; সে মানুষকে ভেঙে ফেলে, বিভাজনকে নীতি বানায়, আর নিরপরাধের কান্নাকে নিজের স্থায়িত্বের মূল্য ভেবে নেয়। তাই এই আয়াত শুধু বনী ইসরাইলের ইতিহাস নয়; এটি প্রতিটি যুগের নিপীড়ক হৃদয়ের বিরুদ্ধে এক চিরন্তন সাক্ষ্য।

আর এই নিষ্ঠুরতার মাঝখানে যে মুক্তি, তা মানুষের শক্তির বিজয় নয়—তা রবের পক্ষ থেকে আগত দয়া, পরীক্ষা, আর জাগরণের ডাক। আল্লাহ বলেন, এতে ছিল তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এক মহান পরীক্ষা। অর্থাৎ মুক্তিও পরীক্ষা, স্মৃতিও পরীক্ষা, আর কৃতজ্ঞতাও পরীক্ষা। যে বান্দা বিপদে আল্লাহকে ডাকে, কিন্তু মুক্তির পর নিজেকে ভুলে যায়, সে আসলে পরীক্ষার অর্থই বুঝতে পারেনি। আর যে জাতি তার উদ্ধারকে ইমানের দায়িত্বে রূপ দেয়, সে জানে—নাজাত কেবল বন্দিত্ব থেকে বের হয়ে আসা নয়; নাজাত হলো অন্তরের জুলুম থেকে মুক্তি পাওয়া, অহংকার থেকে বাঁচা, গুনাহের শেকল ভাঙা। এই আয়াত হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়, কারণ এটি আমাদের স্মরণ করায়: আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন ছাড়া কোনো মুক্তিই পূর্ণ নয়, আর তাকওয়া ছাড়া কোনো স্মৃতিকেই নিরাপদ বলা যায় না।

কুরআন আমাদের স্মরণ করায়—জুলুম কখনো শুধু ইতিহাসের নাম নয়, জুলুম মানুষের ঈমানকে পরীক্ষা করার এক ভয়ংকর আগুন। ফেরাউনের শাসনে বনী ইসরাইলের যন্ত্রণা ছিল এমন, যেখানে শিশুর কান্না, মায়ের আর্তনাদ, আর নিঃশ্বাসের ভেতরেও আতঙ্ক লুকিয়ে থাকত। তবু এই আয়াতের অন্তরে সবচেয়ে বড় কথা, ফেরাউনের হাতে ছিল শুধু সাময়িক ক্ষমতা; আর আল্লাহর হাতে ছিল উদ্ধার, প্রতিশোধ, বিচার, এবং মুক্তির দরজা। মানুষ যখন নিজেকে অপ্রতিরোধ্য ভাবে, তখন আসমানের এক আয়াত তাকে জানিয়ে দেয়—তোমার শক্তি তোমার নয়; তোমার সময়ও তোমার নয়।

আর এ কারণেই এই স্মৃতি আমাদের কেবল সহানুভূতিশীল করে না, বরং ভেতরটা কাঁপিয়ে দেয়। আমরা কি এমন এক রবের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যিনি নিপীড়িতকে দেখেন, দুর্বলকে আশ্রয় দেন, এবং ভয়ংকর পরীক্ষাকেও বান্দার জন্য হিদায়াতের সোপান বানিয়ে দেন? ইতিহাসের সেই জাতির সঙ্গে আজ আমাদের অবস্থাও অদ্ভুতভাবে মিলে যায়—কখনো জুলুমের শিকার হয়ে, কখনো নিজেদের ভেতরের অহংকারে বন্দি হয়ে। তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে অন্তর নরম হওয়া দরকার, জিহ্বা চুপ হওয়া দরকার, আর চোখের গভীরে এই সত্য নামা দরকার: আল্লাহর পরীক্ষা কঠিন হতে পারে, কিন্তু তাঁর রহমত তার চেয়েও বড়। যে হৃদয় এই কথা বুঝে, সে আর গাফিল থাকে না; সে তাওবায় ফেরে, তাকওয়ায় দাঁড়ায়, আর আখিরাতকে ভুলে যায় না।