ফেরাউনের দরবারে আজ যে শব্দ উঠল, তা কেবল একটি রাজসভায় উচ্চারিত ভয় নয়; তা ছিল বাতিলের অন্তরের কাঁপুনি। ‘মূসা ও তার সম্প্রদায়কে কি ছেড়ে দেবে?’—এই প্রশ্নের ভেতরে লুকিয়ে আছে ক্ষমতার পুরনো আতঙ্ক: সত্য যদি চলতে থাকে, তাহলে মিথ্যা টিকবে কীভাবে? আর তাই তারা মূসা (আ.)-কে দেশময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী হিসেবে দেখাতে চাইল। নবীর দাওয়াতকে তারা শৃঙ্খলার শত্রু বানিয়ে উপস্থাপন করল, যেন ন্যায়ের আহ্বানই রাষ্ট্রের জন্য বিপদ। অথচ আসলে বিপদ ছিল তাদের নিজস্ব জুলুম, তাদের জেদ, তাদের অহংকার; সত্য নয়।

এখানে ফেরাউনকে ঘিরে জমে ওঠা এই চক্রান্তে আরো একটি ভয় প্রকাশ পেল—সে তার ‘আল্লাহ’ সুলভ দাবিকে হারাতে বসেছে। কুরআন বলছে, তারা বলল মূসা ও তার সম্প্রদায় তোমাকে ও তোমার দেব-দেবীকে বর্জন করতে চায়। অর্থাৎ তাওহীদের আহ্বান শুধু একটি ধর্মীয় ডাক ছিল না; তা ছিল শিরক-নির্ভর রাজনীতির ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার ঘোষণা। যে সমাজে শাসকের সম্মানই উপাসনার স্তরে উঠে যায়, সেখানে নবীর আগমন মানেই ভাঙনের শুরু। তাই ফেরাউনের সভাসদরা মানুষকে ভয় দেখাতে চাইল, যেন তারা সত্যের দিকে না ঝোঁকে, যেন হৃদয়ে জেগে ওঠা প্রশ্নকে পাপ বলে দমন করে।

এরপর যে হুমকি উচ্চারিত হলো—পুত্রসন্তান হত্যা, কন্যাদের বাঁচিয়ে রাখা—তা নিছক নিষ্ঠুরতা নয়; এটি একটি জাতিকে দুর্বল করে দেওয়ার সুপরিকল্পিত সামাজিক সন্ত্রাস। এই আয়াতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত পুরো সূরার প্রবাহে স্পষ্ট: মূসা (আ.)-এর আগমন, বনী ইসরাঈলের উপর ফেরাউনের দমননীতি, এবং হিদায়াতকে স্তব্ধ করার জন্য জন্মনিরোধক নয়, বরং সন্তানহত্যার মতো ভয়ংকর জুলুম। তবে কুরআন এই ঘটনাকে কেবল ইতিহাস হিসেবে বলে না; আমাদের হৃদয়েও সতর্কতা রেখে যায়—যখন ক্ষমতা সত্যকে ভয় পায়, তখন তা সবচেয়ে আগে মানুষের প্রজন্মকে আঘাত করে। আর আল্লাহর ন্যায়ের পথ কিন্তু থেমে থাকে না; বাতিল যতই প্রবল হোক, তার ওপরে আল্লাহই সর্বশক্তিমান।

ফেরাউনের দরবারে বসে যে ভয় কথা বলে, সে ভয় আসলে শক্তির নয়; সে ভয় এমন এক অন্তর্লুকানো অস্থিরতা, যেখানে মিথ্যা জানে তার মুকুটের নিচে মাটি নরম হয়ে এসেছে। তাই সভাসদরা মূসা (আ.)-কে “ফিতনা” বলে চিহ্নিত করতে চাইল। বাতিলের এ এক পুরনো কৌশল: আলোর আগমনকে অপরাধ বানানো, সত্যের ডাককে বিশৃঙ্খলা বলা, আর মানুষের অন্তর জাগ্রত হলে তাকে রাষ্ট্রদ্রোহের রূপ দেওয়া। কিন্তু কুরআন আমাদের শেখায়, সত্য কখনোই অশান্তির নাম নয়; সত্য হল সেই আয়না, যা জুলুমের মুখে লুকোনো কদর্যতা প্রকাশ করে দেয়। যারা নিজেদের গোমরাহির প্রাসাদকে স্থায়ী ভাবতে চায়, তারা নবীর কণ্ঠস্বর শুনলেই কেঁপে ওঠে। কারণ নবী মানুষের ঘাড়ে পা রেখে ওঠা শাসনকে নয়, মানুষের রবের সামনে দাঁড়ানোর স্মৃতিকে জাগিয়ে দেন।

ফেরাউন যখন বলল, “আমি তাদের পুত্রদের হত্যা করব, আর কন্যাদের বাঁচিয়ে রাখব,” তখন তার মুখ থেকে শুধু নিষ্ঠুরতা বের হয়নি; বেরিয়েছে এক হতাশ নীতিহীন রাজনীতি, যা ভবিষ্যৎকেও ছিন্নভিন্ন করতে চায়। সে জানত, সন্তানই জাতির আগামী; তাই সে আগামীকে হত্যা করতে উদ্যত হল। ইতিহাসে জালেমরা বারবার এমনই করে: তারা কেবল বর্তমানকে নয়, মানুষের পরের দিনটাকেও বন্দি করতে চায়। তবে আল্লাহর কুদরতের সামনে এইসব পরিকল্পনা কত ক্ষুদ্র! যে সন্তানদের সে শেষ করতে চেয়েছিল, তাদেরই একজনের হাত ধরে তার সাম্রাজ্যের ভ্রান্তি প্রকাশিত হবে—এমন সম্ভাবনাও ছিল তার অজানা, অথচ আল্লাহর জ্ঞানে তা আগে থেকেই লিখিত ছিল। এ আয়াত আমাদের হৃদয়ে এই বোধ জাগায় যে, মানুষ যতই ক্ষমতার পাহাড়ে উঠে বসুক, সন্তানের কান্না, দুর্বলদের আর্তি, নিরপরাধের রক্ত—এসবের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা রাজত্ব কখনো নিরাপদ নয়।
এখানে শুধু মূসা (আ.)-এর কাহিনি নেই; আছে প্রতিটি যুগের সেই সত্য, যেখানে হিদায়াতকে থামাতে চাওয়া হয় শোষণের ভাষায়, আর আল্লাহর পথকে রুদ্ধ করতে চাওয়া হয় ভয় দেখিয়ে। কিন্তু মুমিন জানে, পৃথিবীর শাসকেরা কেবল উপায় সাজাতে পারে; ফল নির্ধারণ করেন আল্লাহ। যেদিন ফেরাউনের লোকেরা নিজেদেরকে “প্রবল” বলল, সেদিনই তাদের অন্তঃসারশূন্যতার উচ্চারণ সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল। বাহ্যিক বল জোরে কথা বলে, কিন্তু সে জোরের ভিতরে থাকে ভাঙনের শব্দ। আর ঈমানের মানুষ এই আয়াতে শিখে নেয়—ক্ষমতার মুখে সত্যকে ছোট মনে হলেও, আল্লাহর কাছে সত্যই বড়; জুলুমের প্রাসাদ উঁচু দেখালেও তার ভিত্তি পচে গেছে। তাই এই আয়াত আমাদের কেবল ইতিহাস পড়ে শোনায় না, আমাদের নিজের অন্তরকেও প্রশ্ন করে: আমি কি সত্যের পক্ষে, নাকি শক্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে মিথ্যার স্বস্তিকে বাঁচিয়ে রাখছি?

ফেরাউনের দরবারে আজ যে পরামর্শ উঠল, তা কেবল রাজনৈতিক কৌশল ছিল না; তা ছিল জুলুমের ভেতরে জমে ওঠা এক অন্ধ আতঙ্ক। মূসা (আ.)-কে তারা সমাজের শৃঙ্খলার শত্রু, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিপদ, আর ফেরাউনের দেবত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখাতে চাইল। বাতিলের স্বভাবই এমন—সে সত্যকে কখনো সত্য হিসেবে দেখে না; তাকে সব সময় ‘অরাজকতা’ বলে, ‘বিপদ’ বলে, ‘ফিতনা’ বলে। কিন্তু কুরআন যেন আমাদের হৃদয়ে ফিসফিস করে বলে: যখন কোনো জাতির ক্ষমতা সত্যকে ভয় পেতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে তাদের ভিত নড়ে গেছে। বাহ্যিক রাজপ্রাসাদ অটুট মনে হলেও, অন্তরের সাম্রাজ্য ভেঙে পড়েছে অনেক আগেই।

আর তারপর এল সেই নির্মম ঘোষণা: তাদের পুত্রদের হত্যা করা হবে, কন্যাদের বাঁচিয়ে রাখা হবে, এবং আমরা তাদের ওপর প্রবল। এ শুধু এক জাতির ওপর নির্যাতনের ইতিহাস নয়; এটি মানব-অহংকারের চরম মুখচ্ছবি। দুর্বলকে চূর্ণ করা, ভবিষ্যৎকে হত্যা করা, নারীকেও জীবনের মর্যাদা নয় বরং অপমানের বস্তু বানানো—এমনই হয় যখন হৃদয় থেকে আল্লাহর ভয় উঠে যায়। কিন্তু এই আয়াতের অন্ধকারেই আলোর ইশারা আছে। কারণ ফেরাউনের প্রবলতা যতই ঘোষিত হোক, সে চিরস্থায়ী নয়; মানুষের ওপর জুলুম যতই ভয়ঙ্কর হোক, আল্লাহর ন্যায়বিচার তার চেয়েও অধিক বাস্তব। আজ যে নিজের ক্ষমতায় মাতোয়ারা, যে মানুষের দুর্বলতাকে পায়ে দলে, সে যেন এ আয়াতে নিজের চেহারা দেখে নেয়। মানুষকে দমন করে কেউ আল্লাহর সামনে শক্তিশালী হয় না; বরং নিজের পরিণতিকে আরও ভারী করে তোলে।

এই আয়াত আমাদের নিজেদের জীবনেও ফিরিয়ে আনে। আমরা কি কখনো সত্যকে ‘ঝামেলা’ ভেবে পাশ কাটিয়ে দিই? ন্যায়ের ডাক শুনে অস্বস্তি বোধ করি? পরিবার, সমাজ, কিংবা নিজেদের ভেতরের ছোট ছোট ফেরাউনকে রক্ষা করতে গিয়েই কি আমরা হিদায়াতের আলোকে ভয় পাই? ফেরাউনের সভাসদরা যেমন মূসা (আ.)-এর আগমনকে বিপদ ভাবল, তেমনি বহু হৃদয় আজও তাওবার আহ্বানকে কঠিন মনে করে। অথচ সত্যের পথে হাঁটা মানে শুধু একটি মত গ্রহণ করা নয়; তা মানে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া, নিজের অহংকারকে হত্যা করা, এবং আখিরাতের সামনে দাঁড়িয়ে জবাবদিহির ভয়ে কেঁপে ওঠা। যে হৃদয় আল্লাহকে ভয় করে, সে আর ফেরাউনের ভাষায় কথা বলে না; সে নরম হয়, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়, এবং জানে—শেষ আশ্রয় ক্ষমতা নয়, আল্লাহর রহমত।

এই আয়াতে ফেরাউনের মুখ থেকে যে প্রতিশোধের ভাষা বেরিয়ে এল, তা আসলে শক্তির নয়—ভয়ের ভাষা। যে ক্ষমতা নিজেকে অমর ভাবত, সেই ক্ষমতাই আজ এক নবীর সত্যে কাঁপছে। তারা বলল, তাদের পুত্রদের হত্যা করবে, কন্যাদের বাঁচিয়ে রাখবে; যেন ভবিষ্যৎকে গলা টিপে ধরা যায়, যেন একটি জাতিকে জন্মের আগেই মুছে ফেলা যায়। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো—জুলুম যতই পরিকল্পিত হোক, সে কখনো চূড়ান্ত হয় না। মানুষের রক্তে আঁকা নকশা আল্লাহর ন্যায়ের সামনে কত ক্ষুদ্র! ফেরাউনের চোখে এটি ছিল কৌশল, অথচ আসমানের দৃষ্টিতে এটি ছিল তার পতনেরই আরেকটি স্বীকারোক্তি।
কখনো কি আমরা নিজের ভেতরেও ফেরাউনের এই ছায়া দেখি না? যখন সত্যকে ভয় পাই, যখন নরম ভাষার আড়ালে অন্যায়কে রক্ষা করতে চাই, যখন ন্যায়বোধের কণ্ঠকে ‘সমস্যা’ বলে চুপ করিয়ে দিতে চাই—তখন আমাদের হৃদয়েও এক ক্ষুদ্র ফেরাউনি দরবার জেগে ওঠে। মূসা (আ.)-এর কাহিনি আমাদের শেখায়, আল্লাহর পথে দাঁড়ানো মানুষকে বিচ্ছিন্ন দেখানো যায়, দুর্বল দেখানো যায়, কিন্তু হারানো যায় না। কারণ সে তো মানুষের ভরসায় নয়, রবের ওহির আলোয় হাঁটে। আর সত্যের এই পথেই জাতিসমূহ উঠেছে, আবার ভেঙে পড়েছে; যারা জুলুমকে স্থায়ী ভেবেছিল, তারাই কালের ধুলোয় মিশে গেছে।
আজ এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে অন্তর নত হয়। আমরা যেন ক্ষমতার নেশায় অন্ধ না হই, মিথ্যার সেবায় ভাষা না খরচ করি, আর আল্লাহর নবীদের পথকে সমাজ-রাজনীতির চোখে পরাজিতদের পথ ভেবে অবহেলা না করি। সত্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পুরনো, কিন্তু আল্লাহর হুকুম আরও পুরনো, আরও শক্ত, আরও চিরন্তন। তাই হৃদয় যদি একটু হলেও জেগে থাকে, তবে সে বলবে—হে আল্লাহ, আমাদের ভেতরের ফেরাউনকে ভেঙে দাও, আমাদের মূসার মতো সত্যের সামনে বিনয়ী করে দাও, এবং এমন তাকওয়া দাও যা জুলুমকে ভয় পায় না, বরং তোমাকেই ভয় করে।