“আমরা ঈমান আনছি মহা বিশ্বের পরওয়ারদেগারের প্রতি”—এই একটিমাত্র বাক্যে যেন এক ভয়ের রাত হঠাৎ ভোরের দিকে হেলে পড়ে। সূরা আল-আরাফের এই আয়াতে আমরা দেখি, সত্য যখন হৃদয়ে প্রবেশ করে, তখন মানুষের মুখ থেকে প্রথম উচ্চারণ হয় আত্মসমর্পণের। তারা নিজেদের শক্তির দিকে নয়, ফিরআউনের ভীতি-নির্মিত রাজত্বের দিকে নয়, বরং সমস্ত জগতের রবের দিকে ফিরে দাঁড়ায়। এখানে “রব্বুল আলামিন” শব্দটি শুধু সৃষ্টিজগতের মালিক বোঝায় না; এটি বোঝায় এমন এক পালনকর্তা, যাঁর সামনে রাজা-প্রজা, ভয়-নির্ভয়, জীবন-মৃত্যু—সবাই সমান নত।
এই আয়াতের প্রসঙ্গটি সূরা আল-আরাফে ফিরআউন ও তার জাদুকরদের ঘটনার ধারাবাহিকতায় এসেছে। পূর্বের আয়াতগুলোতে সত্য ও মিথ্যার মুখোমুখি সংঘর্ষের দৃশ্য, মূসা আলাইহিস সালামের নিদর্শন, এবং জাদুকরদের অন্তরভেদী উপলব্ধি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নির্ভরযোগ্যভাবে নির্দিষ্ট কোনো একক শানে নুযুল এখানে আলাদা করে প্রতিষ্ঠিত নয়; তবে কুরআনের ভেতরকার এই প্রেক্ষাপটই আয়াতটির প্রাণ। যে মানুষগুলো মুহূর্ত আগে ক্ষমতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, তারা সত্য স্পর্শ করামাত্রই নিজেদের অবস্থান বদলে ফেলে। এ এক বিস্ময়কর শিক্ষা: হিদায়াত যখন আসে, তখন তা অভ্যাস, ভীতি, স্বার্থ—সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানুষকে নতুন করে জন্ম দেয়।
মুমিনদের এই ঘোষণা আমাদেরও শেখায়, ঈমান কেবল হৃদয়ের নরম অনুভূতি নয়; এটি ভয়ের সামনে দাঁড়িয়ে সত্যকে স্বীকার করার সাহস। ফিরআউনের মত দম্ভ, রাষ্ট্রশক্তি, সামাজিক চাপ, বা জীবিকার আশঙ্কা—কিছুই রবের সত্যের চেয়ে বড় হতে পারে না। “আমরা ঈমান আনছি” মানে শুধু স্বীকারোক্তি নয়; এটি পুরনো মালিকানা ভেঙে নতুন আনুগত্যে প্রবেশ। এই বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে তাকওয়ার জন্ম, আখিরাত-সচেতনতার বীজ, এবং সেই নিশ্চিন্তি—যে মানুষ আল্লাহকে চিনে ফেললে আর কোনো মিথ্যা প্রভুর কাছে মাথা নত করতে পারে না।
কী আশ্চর্য এক মুহূর্ত! যে হৃদয় এতক্ষণ ভয়, ভিড় আর ক্ষমতার চাপে কাঁপছিল, সেই হৃদয় হঠাৎ সত্যের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে উঠল: আমরা ঈমান আনছি। এ কথা শুধু একটি স্বীকারোক্তি নয়; এ যেন ভেতরের সমস্ত ভাঙন থেকে উঠে আসা এক নতুন জন্ম। মানুষ যখন বুঝে ফেলে, ফিরআউনের দম্ভ কোনো আশ্রয় নয়, তখন তার জবান প্রথমে যা উচ্চারণ করে তা হলো রব্বুল আলামিনের প্রতি আনুগত্য। কারণ মিথ্যা যত বড়ই হোক, সে আশ্রয় দিতে পারে না; আর সত্য যতই কঠিন হোক, সে হৃদয়কে মুক্ত না করে ছাড়ে না।
এই আয়াত আমাদের শেখায়, ঈমান অনেক সময় নিরাপদ পরিবেশে জন্ম নেয় না; বরং ভয়, চাপ, অপমান ও হুমকির মাঝখানেই তার আসল রূপ প্রকাশ পায়। সত্য যখন হৃদয়ে নেমে আসে, তখন মানুষ আর বাহ্যিক ক্ষমতার কাছে নত হয় না; সে নত হয় একমাত্র সেই রবের সামনে, যাঁর সামনে সব অহংকার ভেঙে যায়, সব জালিমি রাজত্ব মুছে যায়। সুতরাং এই ঘোষণা শুধু জাদুকরদের নয়—এ ঘোষণা প্রতিটি যুগের হৃদয়ের জন্য: যদি তুমি সত্যকে চিনে ফেলো, তবে দেরি কোরো না; বলো, আমরা ঈমান আনছি রব্বুল আলামিনের প্রতি। কারণ মুক্তি শুরু হয় সেখান থেকেই, যেখানে মানুষ নিজের ভয়কে অস্বীকার করে আল্লাহর দিকে ফিরে দাঁড়ায়।
ফিরআউনের ভয়ভীতি, তার হুমকি, তার ক্ষমতার প্রদর্শন—এসবের মাঝখানে এই বাক্যটি যেন আকাশ ফেটে নামা এক শান্তির নূর: আমরা ঈমান আনছি। এ কথা শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; এটি অন্তরের পক্ষ থেকে দুনিয়ার সব জবরদস্তির প্রতি নীরব বিদ্রোহ। মানুষ যখন সত্যকে চিনে ফেলে, তখন সে বুঝে যায়—ভয় দেখিয়ে হৃদয়কে দখল করা যায় না, যদি হৃদয় একবার রব্বুল আলামিনের দিকে ফিরে যায়। এখানে ঈমান মানে কেবল বিশ্বাস করা নয়; ঈমান মানে নিজের অস্তিত্বকে এমন এক প্রভুর হাতে সঁপে দেওয়া, যাঁর জ্ঞান সবকিছুকে ঘিরে আছে, যাঁর ক্ষমতার সামনে ফিরআউনের প্রাসাদও তুচ্ছ, আর যাঁর সামনে মাটির ধূলিকণাও সম্মানিত।
এই আয়াত আমাদেরও নিজের দিকে ফিরিয়ে আনে। আমরা কি সত্যের কাছে এমনই আত্মসমর্পণ করেছি, নাকি এখনো মানুষের ভয়ের কাছে, দুনিয়ার চাপের কাছে, নিজের নফসের অহংকারের কাছে নত হয়ে আছি? মুমিনের সমাজ তখনই জেগে ওঠে, যখন সে ভয়কে ঈমানের ওপর প্রাধান্য দিতে শেখে না; বরং ভয়কে আল্লাহর দিকে ফেরার সিঁড়ি বানায়। আজও পৃথিবীর বহু ফিরআউন আছে—কখনো তারা শাসনের রূপে, কখনো সম্পদের মোহে, কখনো নিজের ভেতরের আত্মগরিমায় দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু এই আয়াত আমাদের বলে দেয়, শেষ আশ্রয় ক্ষমতা নয়, শেষ আশ্রয় প্রতিপালক। যে হৃদয় বলেছে, আমরা ঈমান আনছি রব্বুল আলামিনের প্রতি, সে হৃদয় আর মানুষের বন্দি থাকে না; সে আখিরাতের দিকে মুখ ফেরায়, তাকওয়ার আলোয় হাঁটে, এবং মৃত্যুর পরেও যে সত্য বাকি থাকে, সেই সত্যের সঙ্গেই নিজেকে জুড়ে দেয়।
কখনো কখনো ঈমান এমন এক মুহূর্তে জন্ম নেয়, যখন মানুষের সামনে বাঁচার কোনো হিসাব থাকে না—শুধু সত্যের সামনে পড়ে থাকা একটি কাঁপতে থাকা হৃদয় থাকে। ফিরআউনের ভয়, শাস্তির হুমকি, দম্ভের গর্জন—এসবের মাঝখানে তারা বলল, আমরা ঈমান আনছি মহা বিশ্বের পরওয়ারদেগারের প্রতি। এই ঘোষণা কোনো শিক্ষিত তর্কের ফল নয়, কোনো সামাজিক সুবিধার হিসাব নয়; এটি ছিল সত্যকে চিনে ফেলার পর আত্মাকে আর পিছিয়ে না রাখার নাম। মানুষের শক্তি যখন শেষ হয়ে যায়, তখনই অনেক সময় রবের পরিচয় সবচেয়ে পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
রব্বুল আলামিন—এই নামের মধ্যে কত বিস্তৃত আশ্রয়! যিনি শুধু এক জাতির রব নন, এক কালেরও নন, এক ভয়েরও নন; তিনি সমস্ত জগতের পালনকর্তা। তাই মুমিনের অন্তর আর কোনো সিংহাসনের সামনে সিজদা করে না, আর কোনো জুলুমের সামনে নত হয় না। সে জানে, দুনিয়ার ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, আর আল্লাহর সত্য চিরস্থায়ী। এই আয়াত আমাদেরও জিজ্ঞেস করে—আমরা কি সত্যকে এতটাই চিনি যে, সত্যের কাছে হার মানতে ভয় পাই না? নাকি এখনো মানুষের ভয়ের কাছে নিজেদের ঈমানকে ছোট করে রাখি?
তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে হৃদয়কে শেখাতে হয় বিনয়। কারণ ঈমান শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; এটি ভেতরের দম্ভ ভেঙে ফেলা, নিজের আশ্রয়চিন্তা বদলে ফেলা, এবং রবের দিকে ফিরে যাওয়া। যে মানুষ বলে, আমরা ঈমান আনছি, সে আসলে ঘোষণা করে—আমার ভয় আর আমার ভরসা এক নয়, আমার জীবন আর আমার মালিক এক নন, আমার আত্মা এখন রব্বুল আলামিনের দরজায় নত। হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরেও এমনই এক সত্য-জাগরণ দান করুন, যাতে ভয় আমাদের গলাতে না পারে, গুনাহ আমাদের অন্ধ না করে, আর আখিরাতের পথে আমাদের পদক্ষেপ স্থির থাকে।