সত্য প্রতিশ্রুত সময় যখন কাছে এসে যায়, তখন মানুষের সব ভরসা, সব অজুহাত, সব অহংকার এক মুহূর্তে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এই আয়াত যেন কিয়ামতের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের হৃদয়ে কড়া নাড়ে। আল্লাহ জানিয়ে দিচ্ছেন, যাকে মানুষ বহু দূরের কিছু মনে করে বেঁচে থাকে, সেটাই একদিন হঠাৎ অতি নিকটবর্তী হয়ে উঠবে। তখন কাফিরদের দৃষ্টি স্থির হয়ে যাবে, চোখের পলক যেন জমে যাবে আতঙ্কে; কারণ তারা যে সত্যকে অস্বীকার করেছিল, তা আর কল্পনা নয়, সামনে উপস্থিত বাস্তব। সেই মুহূর্তে মুখে উঠে আসবে হাহাকার—হায় আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা তো এ বিষয়ে গাফিল ছিলাম; কিন্তু গাফিলতির আড়ালে আসল কথা হলো, আমরা ছিলাম জুলুমকারী, নিজেদেরই আত্মার উপর, নিজেদের রবের হক-এর উপর অবিচারকারী।
এই বাণীর তাৎক্ষণিক সুর শুধু কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যতের গল্প নয়; এটি মানুষের অন্তরের ঘুম ভাঙানোর আহ্বান। আল্লাহর দেওয়া অবকাশকে যারা স্থায়িত্ব মনে করে, দুনিয়ার ব্যস্ততাকে যারা চূড়ান্ত বাস্তবতা ভাবে, তাদের জন্য এ আয়াত আয়নার মতো। কিয়ামত যখন নিকটবর্তী হবে, তখন আর তর্কের সময় থাকবে না, আর ঢেকে রাখার সুযোগ থাকবে না। মানুষ বুঝবে, যে গাফিলতি সে লালন করেছে, তা ছিল তার নিজেরই ধ্বংসের বীজ। তাওহীদের আলো থেকে দূরে সরে গিয়ে, দোয়া ও তওবার দরজা অগ্রাহ্য করে, আল্লাহর সামনে জবাবদিহির কথা ভুলে গিয়ে মানুষ নিজেকে কত বড় শূন্যতায় দাঁড় করায়—এই আয়াত তা হৃদয়বিদারকভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়।
সুরা আল-আম্বিয়ার এই অংশটি নবীদের দীর্ঘ আহ্বানের ধারার ভেতরেই বয়ে চলেছে—যে আহ্বান মানুষের কাছে বারবার এসেছে, আল্লাহ একমাত্র ইলাহ, তাঁরই কাছে ফিরে যেতে হবে, তাঁরই সামনে শেষ হিসাব। এ আয়াতে কোনো নির্দিষ্ট, প্রামাণ্য একক শানে নুযূল নির্ধারিত নয়; বরং এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য এক সার্বজনীন সতর্কবাণী, যা মক্কি সূরার বড় উদ্দেশ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নবীদের দাওয়াত, মানুষের পরীক্ষা, আল্লাহর রহমত ও বিচার—সবকিছুর মাঝখানে এই আয়াত বলে দেয়, আজ গাফিল হওয়া সহজ, কিন্তু সে গাফিলতার শেষ পরিণতি খুবই নির্মম। তাই যে হৃদয় এখনই নরম হয়, সে দেরি হওয়ার আগেই ফিরে আসে; কারণ প্রতিশ্রুত সত্য যখন কাছে আসে, তখন আর আফসোসের ভাষা থাকে না, থাকে শুধু নিজের কৃতকর্মের মুখোমুখি দাঁড়ানো।
এই আয়াতের ভেতরে একটি নির্মম কিন্তু করুণ জাগরণ আছে। মানুষ দুনিয়ার আলো-আঁধারিতে এতটাই মগ্ন হয়ে যায় যে সত্যকে দূরের কোনো কাহিনি মনে করে; কিন্তু আল্লাহ যখন প্রতিশ্রুত সত্যকে নিকটবর্তী করে দেন, তখন সময় আর মানুষের হাতে থাকে না। যাকে অবিশ্বাস করা হয়েছিল, যাকে হালকা করে দেখা হয়েছিল, সেটাই সামনে এসে দাঁড়ায় অবিচল পাহাড়ের মতো। তখন চোখ স্থির হয়ে যায়, কারণ চক্ষু তখন আর দৃশ্য দেখে না—অন্তরের নগ্ন বাস্তবতা দেখে। সেই মুহূর্তে অস্বীকারের সব পর্দা ছিঁড়ে পড়ে, আর মানুষ বুঝতে পারে, সে যা এড়িয়ে গিয়েছিল তা ছিল তারই সবচেয়ে বড় সত্য।
এই স্মরণ তাই ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং জীবিত করার জন্য। আজ যদি হৃদয় নরম হয়ে যায়, যদি দোয়ার দরজা খুলে যায়, যদি তাওহীদের আলো অন্তরে ফিরে আসে, তবে কিয়ামতের আতঙ্কও হেদায়েতের পথ হয়ে উঠতে পারে। আল্লাহর রহমত সেইসব বান্দার জন্য প্রশস্ত, যারা দেরি করেও ফিরে আসে, যারা নিজেদের ভুলকে স্বীকার করে, যারা গাফিলতির গভীরতা থেকে তওবার দিকে হাঁটে। এই আয়াত আমাদের কানে ফিসফিস করে বলে—যে সত্য একদিন অনিবার্যভাবে সামনে দাঁড়াবে, তাকে আজ হৃদয়ে বসাও। কারণ আজকের ইমান, আজকের সিজদা, আজকের অশ্রু—এসবই কালকের নিরাপত্তা। আর যে বান্দা এখনই জেগে ওঠে, তার জন্য ভয়ও হয় রহমতের দরজা, আর জবাবদিহির স্মরণও হয় আল্লাহর দিকে ফেরার মিষ্টি ডাক।
মানুষের জীবন কত অদ্ভুত—আজ যে হৃদয় আল্লাহর স্মরণে কাঁপে না, কাল তারই চোখ কিয়ামতের সত্যের সামনে স্থির হয়ে যাবে। এই আয়াত গাফিলতির সেই পর্দা ছিঁড়ে দেয়, যে পর্দার আড়ালে আমরা দুনিয়ার কাজ, হিসাব, আনন্দ, ভয়, প্রতিযোগিতা—সবকিছুকে এত বড় করে দেখি যে আখিরাতকে ছোট ভাবি। অথচ সত্য প্রতিশ্রুতি দূরে নয়; দুনিয়ার মায়ার পর্দা সরলেই বোঝা যায়, আমাদের প্রতিটি শ্বাসই সেই চূড়ান্ত সাক্ষাতের দিকে এগোচ্ছে। তখন কাফিরদের বিস্ময় হবে নয়, আতঙ্ক হবে; কারণ তারা যা অস্বীকার করেছিল, তা আর তর্কের বিষয় থাকবে না, দাঁড়িয়ে থাকবে বাস্তব হয়ে।
সেই মুহূর্তে মানুষ নিজের ভাষা খুঁজে পাবে না, শুধু হাহাকার করবে—হায় আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা এ বিষয়ে বেখবর ছিলাম। কিন্তু এই বেখবর থাকা কেবল অজ্ঞতার নাম নয়, এটি জুলুমের নামও বটে; নিজের আত্মার উপর জুলুম, রবের সতর্কবাণীকে অবহেলা করার জুলুম, সত্য জানার সুযোগ পেয়েও তাতে ফিরে না আসার জুলুম। আর এ কারণেই সূরাটি আমাদের শুধু ভয় দেখায় না, জাগিয়ে তোলে। আজই তাওহীদের দিকে ফিরতে বলে, আজই দোয়ার দরজা আঁকড়ে ধরতে বলে, আজই নিজের আমল, নিয়ত, সম্পর্ক, উপার্জন, গোপন পাপ—সবকিছুর হিসাব নিতে বলে। কারণ আল্লাহর রহমত বিশাল, কিন্তু সেই রহমতকে অবহেলার ঘুমে হারিয়ে ফেলা ভয়াবহ। যেদিন সত্য কাছে আসবে, সেদিন আর আক্ষেপে কিছু বদলাবে না; তাই আজই অন্তরকে জাগ্রত করাই মু’মিনের কাজ, আজই ফিরে আসাই মুক্তির শুরু।
এই আয়াত আমাদের কেবল ভবিষ্যতের ভয় দেখায় না; এটি আজকের গাফিলতিকে চিহ্নিত করে। মানুষ কত সহজে ভাবে—সময় আছে, সুযোগ আছে, পরে ফেরা যাবে। অথচ সত্য প্রতিশ্রুতি যখন নিকটবর্তী হয়, তখন সময়ের সব দরজা একে একে বন্ধ হয়ে যায়, আর যে চোখ দুনিয়ায় হাজার দৃশ্যে অভ্যস্ত ছিল, সেই চোখই বিস্ময়ে স্থির হয়ে পড়ে। সেদিন বোঝা যায়, অবহেলা কোনো নিরীহ ব্যাপার ছিল না; তা ছিল অন্তরের বিরুদ্ধে এক নীরব জুলুম, আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকার এক করুণ অভ্যাস।
আজ যদি এই আয়াত হৃদয়ে পৌঁছে যায়, তবে সেটাই রহমত। কারণ আল্লাহ আগে জাগিয়ে দেন, পরে হিসাব নেন। যে এখনও শ্বাস নিচ্ছে, তার জন্য এখনও ফেরা সম্ভব; যে এখনও লজ্জা বোধ করে, তার জন্য এখনও তাওবা বেঁচে আছে; যে এখনও “হায় আমাদের দুর্ভাগ্য” বলার আগে নত হতে পারে, তার জন্য এখনও দয়ার দরজা খোলা। তাই এই মুহূর্তে অন্তরকে নরম করো, রবের সামনে দাঁড়ানোর ভঙ্গি শিখো, তাওহীদের ওপর ভরসা রাখো, দোয়ার হাত তুলো—যেন কিয়ামতের দিন বিস্ময়ে স্থির চোখ নয়, বরং ঈমানের আলোতে ভরা এক বিনীত হৃদয় নিয়ে তুমি তাঁর সামনে উপস্থিত হতে পারো।