এই আয়াতে আল্লাহ এক মহিমান্বিত সত্য খুলে দিচ্ছেন: মানুষকে যখন তার চারপাশের অন্ধকার ঘিরে ফেলে, তখনও আল্লাহর রহমতের দরজা বন্ধ হয় না। “আমি তাকে আমার অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম”—এই বাক্যটি যেন বান্দার জীবনে আকাশের মতো প্রশস্ত এক আশ্বাস। এখানে কেবল বাঁচিয়ে তোলার কথা নয়, বরং নিজের বিশেষ দয়ার ছায়ায় গ্রহণ করার কথা। কুরআনের এই অংশে হযরত লূত আলাইহিস সালামের প্রসঙ্গ চলেছে; তাঁর জাতির বিপর্যস্ত সমাজ, অবাধ্যতা ও নৈতিক ভাঙনের মাঝে আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করেছেন এবং জানিয়েছেন—তিনি সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ, পরীক্ষার ভেতরেও তাঁর অন্তর আল্লাহর দিকে ছিল, তাঁর পথ ছিল পবিত্রতার পথ।

এখানে “সৎকর্মশীলদের একজন” কথাটি শুধু একটি পরিচয় নয়; এটি একটি মর্যাদা। নেককার হওয়া মানে কেবল কিছু কাজ করা নয়, বরং ঈমানকে জীবনের ভিত বানানো, আল্লাহর হুকুমের সামনে নরম হৃদয়ে ঝুঁকে পড়া, হারাম-হালাল, সত্য-মিথ্যা, পবিত্রতা-অপবিত্রতার সীমা রক্ষা করা। এই আয়াত আমাদের শেখায়, আল্লাহর রহমত কেবল দুর্বলতার জন্য নয়; বরং যারা নেকির পথে অবিচল থাকে, যারা বিপদের মধ্যে তাওহীদ আঁকড়ে ধরে, তাদের জন্যও। বান্দা যতই ভাঙুক, যদি তার ভেতরে সৎকর্মের প্রাণ থাকে, আল্লাহ তাকে নিজের রহমতের অঙ্গীকারে ফিরিয়ে আনতে পারেন।

তাই এই আয়াত হৃদয়ে এক অদ্ভুত সান্ত্বনা জাগায়। দুনিয়ার আদালতে মানুষ পরিচিত হয় তার সাফল্য, বংশ, শক্তি বা মুখরতার মাধ্যমে; কিন্তু আসমানের দরবারে মানুষ গ্রহণ পায় তার তাকওয়া, তার আমল, তার আনুগত্যের কারণে। লূত আলাইহিস সালামের এই পরিচয় আমাদেরও ডাকে—আমরা কি এমন জীবনের দিকে চলছি, যা আল্লাহর রহমতের উপযোগী? নাকি নিজের ইচ্ছার গোলামে থেকে রহমতের পথ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি? এই আয়াত যেন চুপচাপ বলে, নেককার হও; কারণ শেষ পর্যন্ত বাঁচায় কেবল আল্লাহর রহমতই, আর সেই রহমত তিনি তাদেরকেই বিশেষভাবে দান করেন, যারা তাঁর পথে সৎ ও স্থির থাকে।

আল্লাহ যখন বলেন, আমি তাকে আমার অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম, তখন যেন বান্দার সমস্ত ভয় এক মুহূর্তে নরম হয়ে যায়। এই বাক্যে আছে আশ্রয়, আছে গ্রহণ, আছে এমন এক দয়া—যা মানুষ নিজে অর্জন করে না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। পরীক্ষার ধুলো, অবিচারের অন্ধকার, মানুষের হীনতা—সবকিছুর ভেতর দিয়েই তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাকে টেনে নেন রহমতের নিরাপদ বেষ্টনীর ভেতর। কুরআনের এই প্রসঙ্গে হযরত লূত আলাইহিস সালামের কথা মনে আসে; তাঁর সমাজের নৈতিক পতনের মাঝেও আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করেছেন। এটি আমাদের শেখায়, পরিবেশ যতই কলুষিত হোক, আল্লাহর রহমত তার থেকেও বৃহৎ।

তারপর আসে এক নীরব কিন্তু ভারী ঘোষণা: নিশ্চয়ই সে সৎকর্মশীলদের একজন ছিল। এই কথার মধ্যে শুধু অতীতের প্রশংসা নেই, ভবিষ্যতের পথও আছে। সৎকর্মশীল হওয়া মানে শুধু কিছু ভালো কাজ করা নয়; মানে হৃদয়ের মধ্যে তাওহীদের আলো জাগিয়ে রাখা, আল্লাহর হুকুমের সামনে নিজেকে বিনম্র করা, পবিত্রতাকে সহজে ছাড় না দেওয়া, এবং সত্যকে একাকী হলেও আঁকড়ে ধরা। নেককারদের পরিচয় বাহ্যিক সুনামে নয়; তাদের জীবন-রক্তে মিশে থাকে আনুগত্য, ধৈর্য, লজ্জা, নিষ্ঠা, এবং আল্লাহমুখিতা।
এই আয়াত আমাদের বুকের ভেতর এক গভীর আশা জাগায়—পরীক্ষা শেষ কথা নয়, আল্লাহর রহমতই শেষ আশ্রয়। যে বান্দা নিজেকে সৎকর্মের পথে রাখে, তার জন্য আল্লাহর দরজা শুধু খোলা থাকে না, তিনি তাকে নিজের অনুগ্রহের ভেতর গ্রহণ করেন; আর এ গ্রহণ কেবল ক্ষমা নয়, মর্যাদা, নিরাপত্তা, এবং অন্তরের শান্তিও। তাই জীবন যখন কঠিন হয়, তখন প্রশ্ন শুধু এই নয় যে আমি কতটা ভেঙেছি; প্রশ্ন হলো, আমি এখনো কি আল্লাহর দিকে ফিরে আছি? যদি ফিরে থাকি, তবে জানি—আমার রব আমাকে রাস্তায় ফেলে রাখেন না, তিনি আমাকে তাঁর রَحْمَتِنَا-র ছায়ায় তুলে নেন।

কখনও মানুষ এমন এক সমাজে দাঁড়িয়ে যায়, যেখানে চারদিকে নৈতিক পতনের ধুলো, সত্যের মুখে উপহাস, আর পাপের সঙ্গে স্বাভাবিকতার অভিনয়। তবু আল্লাহ যখন বলেন, “আমি তাকে আমার রহমতের অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম”, তখন বোঝা যায়—বান্দার চারপাশের অন্ধকার তার নিয়তি নয়; আল্লাহর বিশেষ দয়া তার জন্য আরও বড় বাস্তবতা। এই আয়াতের প্রসঙ্গে যে নবীর কথা এসেছে, তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ঈমানের মানুষ কেবল টিকে থাকে না, আল্লাহর সুরক্ষায় বেঁচে থাকে। পরীক্ষা তাকে ঘিরে ধরতে পারে, কিন্তু রহমত তাকে গ্রাস করে নেয়; পৃথিবী তাকে একা ভাবতে পারে, কিন্তু আসমানের সিদ্ধান্ত তাকে নিজের ছায়ায় তুলে নেয়।

আর “সে ছিল সৎকর্মশীলদের একজন”—এই বাক্যটি হৃদয়ের উপর ভারী এক মুদ্রার মতো পড়ে। কারণ নেককার হওয়া মানে কেবল কিছু ভালো কাজ করা নয়; বরং অন্তরের ভেতর থেকে আল্লাহর দিকে ফিরে থাকা, গোপনে ও প্রকাশ্যে তাঁর সীমার প্রতি বিশ্বস্ত থাকা, পাপের স্বাদ জেনেও তা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা। সৎকর্মশীলদের পরিচয় হলো তাদের জীবন আল্লাহর প্রতি আনুগত্যে নরম, আর গোনাহের সামনে কঠিন। তাই এই আয়াত আমাদের নিজের হিসাব নিজের কাছেই তুলে দেয়: আমি কি এমন লোকদের মধ্যে আছি, নাকি শুধু মুখে আশা করছি? আমার নাম কি দুনিয়ার বাহ্যিক সাফল্যে লেখা, নাকি আল্লাহর কাছে নেককারদের তালিকায় সামান্যও জায়গা পেয়েছে?

আসলে এই আয়াত ভয় ও আশার মাঝের সেই সরল, দীপ্ত পথ দেখায়—ভয়, যদি আমরা গাফিলতিতে মরে যাই; আর আশা, যদি তাওবা করে, সৎকর্মে স্থির হই। আল্লাহর রহমত কোনো দূরের কথা নয়, কিন্তু তা হেলাফেলায় পাওয়া যায় না; তা সেই হৃদয়কে আশ্রয় দেয়, যে হৃদয় নিজের দুর্বলতা বোঝে, রবের দরজায় কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়ায়, আর নেকির পথে ফিরে আসে। আজ এই বাক্য আমাদের বলে: পরীক্ষা শেষ কথা নয়, সমাজের পচনও শেষ কথা নয়, নিজের অতীতও শেষ কথা নয়। শেষ কথা হলো আল্লাহর রহমত—যদি আমরা তাঁর দিকে ফিরে যেতে জানি, তবে তিনিই আমাদেরও নিজের রহমতের অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন।

আল্লাহ যখন বলেন, “আমি তাকে আমার অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম,” তখন তা শুধু একটি অতীত ঘটনা নয়; এ যেন প্রতিটি ভাঙা হৃদয়ের জন্য আকাশ-ছোঁয়া বার্তা। মানুষের বিচার যেখানে শেষ হয়ে যায়, আল্লাহর রহমত সেখানেই শুরু হয়। পরীক্ষার আঁধারে দাঁড়িয়ে যিনি তাঁর দিকে মুখ ফেরান, যিনি নেকির পথকে আঁকড়ে ধরেন, যিনি অন্তরে পবিত্রতা রক্ষা করেন—তার জন্য এ ঘোষণা আজও জীবন্ত: তুমি একা নও, তুমি আমার রহমতের ভেতরে হতে পারো। সৎকর্মশীলদের মর্যাদা এই যে, তারা আল্লাহর কাছে কেবল সফল নয়; তারা গ্রহণকৃত। আর এ গ্রহণ হওয়া-ই তো জীবনের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।

এই আয়াতের সামনে এসে মানুষ নিজের আমল নিয়ে গর্ব করতে পারে না; বরং লজ্জায় নত হয়। কারণ সৎকর্মশীল হওয়া কোনো মুখের দাবি নয়, এটি হৃদয়ের অবস্থা, পথের স্থিরতা, গুনাহের সামনে ভাঙা এক আত্মসমর্পণ। আজ যদি আমরা আল্লাহর রহমতের অন্তর্ভুক্ত হতে চাই, তবে আমাদেরও তাওহীদের দিকে ফিরে আসতে হবে, দোয়ার হাত তুলতে হবে, ধৈর্যের সঙ্গে সত্যকে আঁকড়ে ধরতে হবে, আর অন্তরকে পবিত্র রাখার সংগ্রামে ক্লান্ত হওয়া চলবে না। শেষ কথা রহমতই, কিন্তু সেই রহমতের পথটি নেককারদের পথ। আল্লাহ আমাদেরকে সেই পথেরই মানুষ করে দিন—যাদের তিনি নিজের অনুগ্রহে টেনে নেন, যাদের নাম তিনি সৎকর্মশীলদের কাতারে লিখে রাখেন।