রাসূলদের জীবনকে যারা কেবল মানবিক দুর্বলতার দৃষ্টিতে দেখেছে, তাদের চোখে সত্য সবসময়ই হাস্যকর মনে হয়েছে। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা এক ভয়ংকর কিন্তু চিরসত্য কথা স্মরণ করিয়ে দেন: আপনার আগেও বহু রাসূলকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হয়েছে। নবীদের পথ কখনোই বাহ্যিক সম্মান আর সহজ গ্রহণযোগ্যতার পথ ছিল না; তাদের দাওয়াতের সামনে অহংকারী সমাজ প্রথমে ঠাট্টা করেছে, পরে অস্বীকার করেছে, তারপর ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। যারা সত্যকে হালকা ভেবে উড়িয়ে দিতে চেয়েছে, আল্লাহ তাদের সেই হালকাভাবকেই ফিরিয়ে দিয়েছেন তাদেরই উপর ভারী বোঝা হয়ে।
এই আয়াতের পেছনে কোনো একক, নির্দিষ্ট ঘটনা হিসেবে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না; বরং এটি কুরআনের বিস্তৃত ঐতিহাসিক বাস্তবতার একটি পরম সত্যকে তুলে ধরে। নূহ, হূদ, সালেহ, মূসা, ঈসা আলাইহিমুস সালামসহ বহু নবীই তাদের জাতির বিদ্রূপ, কটাক্ষ, অপমান ও প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হয়েছেন। মানবসমাজ যখন অহংকারে অন্ধ হয়, তখন আল্লাহর বাণী তাদের কাছে তুচ্ছ লাগে; কিন্তু আল্লাহর ন্যায়ের সামনে এই তুচ্ছতাই একদিন কঠিন বাস্তব হয়ে ফিরে আসে। আয়াতটি তাই শুধু অতীতের কাহিনি নয়, বরং প্রতিটি যুগের জন্য সতর্কবার্তা—সত্যের বিরুদ্ধে হাসা সহজ, কিন্তু সেই হাসির পরিণাম বহন করা কঠিন।
এখানে তাওহীদের আলোও স্পষ্ট হয়ে ওঠে: রাসূলদের বিদ্রূপ মানে কেবল একজন মানুষের অবমাননা নয়, বরং সেই আহ্বানকে অবমাননা করা, যা মানুষকে এক আল্লাহর দিকে ডাকে। আর কিয়ামতের স্মৃতিও এর ভেতর লুকিয়ে আছে—কারণ দুনিয়ার এই বিদ্রূপ হয়তো কিছুদিন চাপা থাকে, কিন্তু আখিরাতে সত্য ও মিথ্যার বিচার হবে সম্পূর্ণ আলাদা মাপে। যারা নবীদের কণ্ঠকে উপহাস করেছে, তারা আসলে নিজেদেরই ভবিষ্যৎকে উপহাস করেছে। এই আয়াত হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়, কারণ এটি বলে: আল্লাহর সত্যকে ঠাট্টা করা ক্ষণিকের আনন্দ, কিন্তু তার প্রতিফল একদিন অবশ্যই এসে পৌঁছায়; আর আল্লাহর রহমত কেবল তাদের জন্য, যারা বিদ্রূপ নয়, বিনয়ের সঙ্গে সত্যের সামনে নত হয়।
নবীদের পথে বিদ্রূপ নতুন কিছু নয়। সত্য যখন মানুষের অহংকারের মুখে এসে দাঁড়ায়, তখন তার প্রথম প্রতিক্রিয়া প্রায়ই হয় হাসি, কটাক্ষ, অবজ্ঞা। কারণ সত্য হৃদয়ে আলো জ্বালায়, আর অহংকার সেই আলোকে সহ্য করতে পারে না। এই আয়াত যেন আমাদের সামনে ইতিহাসের দীর্ঘ, রক্তাক্ত সত্যটি খুলে ধরে: আল্লাহর রাসূলদের কথাকে যারা তুচ্ছ ভেবেছে, তারা আসলে নিজেরাই নিজেদের অন্তরকে তুচ্ছতার অন্ধকারে নিক্ষেপ করেছে। নবীরা মানুষের কাছে অপমানিত হয়েছেন, কিন্তু আল্লাহর কাছে তারা অপমানিত হননি। বরং অপমানের মুহূর্তগুলোই প্রমাণ করেছে—কারা আল্লাহর পক্ষের, আর কারা নিজের নফসের পক্ষের।
রাসূলদের জীবনকে যে মানুষ ঠাট্টার চোখে দেখেছে, সে আসলে সত্যকে দেখেনি; সে নিজের অহংকারের আয়নায় নিজের মুখই দেখেছে। আল্লাহ তাআলা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন—আপনার আগেও বহু নবীকে বিদ্রূপ করা হয়েছে। দাওয়াতের প্রথম প্রতিক্রিয়া অনেক সময়ই ছিল হালকা হাসি, বিদ্রূপের তীর, অপমানের শব্দ; যেন সত্যকে সামান্য করে দেখাতে পারলেই সত্য মুছে যাবে। কিন্তু আল্লাহর বাণী মানুষের উপহাসে নত হয় না। নবীদের পথ কখনও জনতার বাহ্যিক প্রশংসায় নিরাপদ ছিল না; বরং পরীক্ষা, ধৈর্য, এবং দৃঢ় তাওহীদের দীপ্তিতেই তা আলোকিত হয়েছে।
অতঃপর যে বিষয়কে তারা হাস্যকর ভেবেছিল, তা-ই তাদের ঘিরে ধরেছে। এ এক ভয়ংকর নিয়ম—মানুষ যখন আল্লাহর সতর্কবাণীকে তুচ্ছ করে, তখন তুচ্ছ ভেবেই সে নিজের পরিণতির দিকে হাঁটে। আজও সমাজে সত্যের আহ্বানকে বিদ্রূপ করা হয়, ন্যায়কে পুরোনো বলে ঠেলে দেওয়া হয়, আল্লাহভীতিকে দুর্বলতা মনে করা হয়; কিন্তু কিয়ামতের স্মৃতি জানিয়ে দেয়, শেষ বিচারে হাসি কার মুখে থাকবে তা মানুষ নির্ধারণ করে না, নির্ধারণ করেন আল্লাহ। তাই এই আয়াত আমাদের কাঁপিয়ে জিজ্ঞেস করে: আমি কি কখনও সত্যকে হালকা ভেবে দূরে ঠেলে দিয়েছি? আমি কি কারও ঈমান, কারও পর্দা, কারও দোয়া, কারও তাওবার দিকে বিদ্রূপের দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছি? যদি করে থাকি, তবে আজই ফিরে আসার সময়। কারণ আল্লাহর ন্যায় দেরি করতে পারে, কিন্তু গাফিল হতে পারে না; আর তাঁর রহমতও অপেক্ষা করে—ফিরে আসা অন্তরের জন্য।
মানুষের ঠোঁট থেকে বের হওয়া বিদ্রূপ অনেক সময় সামান্য শব্দের মতো লাগে, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক গোপন বিদ্বেষ—সত্যকে ছোট করা, আল্লাহর নবীকে তুচ্ছ করা, হিদায়াতকে হাস্যকর বানানো। এই আয়াত আমাদের কানে কেবল ইতিহাস শোনায় না; এটি আজকের হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে। কারণ সত্যকে উপহাস করার রোগ কোনো এক জাতির ছিল না, তা অহংকারে পাথর হয়ে যাওয়া প্রতিটি যুগেরই রোগ। আর আল্লাহর বিধান এই যে, যা কিছু তিনি হক হিসেবে পাঠিয়েছেন, তাকে অবজ্ঞা করে কেউ চিরকাল নিরাপদ থাকতে পারে না। সত্যকে নিয়ে যারা হাসে, সময় একদিন তাদের হাসিকেই নীরব করে দেয়।
কত মানুষ জিহ্বার স্বাচ্ছন্দ্যে নবীদের কথা উড়িয়ে দিয়েছে, অথচ শেষে নিজের অন্তরের শূন্যতা, নিজের গর্বের ভাঙন, নিজের কৃতকর্মের ফলই তাদের ঘিরে ধরেছে। এ আয়াত আমাদের শেখায়, দাওয়াতের পথে অপমান এলে তা অস্বাভাবিক নয়; বরং সেটাই অনেক সময় সত্যের পথের পুরোনো চিহ্ন। কিন্তু এর চেয়েও বড় শিক্ষা হলো—আমরা যেন নিজেরাই বিদ্রূপকারীদের কাতারে না দাঁড়াই। আল্লাহর আয়াত, নামাজ, হালাল-হারাম, মৃত্যু, কিয়ামত, ক্ষমা, রহমত—এসবকে হালকা ভাবা হৃদয়ের জন্য ভয়ংকর। যে অন্তর আজ সত্যকে ঠাট্টা করে, কাল সে অন্তরই সত্যের সামনে ভেঙে পড়তে পারে; কিন্তু তখন অনুতাপের দরজা খোলা থাকবে কি না, তা আমরা জানি না।
তাই আজ এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে হৃদয় নত হোক। আমরা যেন নবি-রাসূলদের সম্মান করি, আল্লাহর বাণীকে ভারী করে ধরি, এবং নিজেদের জিভকে এমন সব কথার হাত থেকে বাঁচাই যা আখিরাতে আমাদেরই বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। মানুষ যাকে অবহেলা করে, আল্লাহ তা-ই দিয়ে পরীক্ষা করেন; মানুষ যাকে মিথ্যা ভাবে, আল্লাহ তা-ই দিয়ে নিজের ন্যায় প্রকাশ করেন। সুতরাং বিদ্রূপের সাহস নয়, তাওবা’র কম্পনই হোক আমাদের আশ্রয়। কারণ আজ যে সত্যকে আমরা শ্রদ্ধাভরে গ্রহণ করি, কাল সেটাই আমাদের জন্য নাজাতের আলো হতে পারে; আর আজ যে সত্যকে অবহেলা করি, কাল সেটাই আমাদের জন্য আফসোসের আগুন হয়ে দাঁড়াতে পারে।