প্রত্যেক প্রাণকে মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে—এই একটি বাক্যেই মানুষের সব অহংকার, সব পরিকল্পনা, সব নিরাপত্তাবোধ নীরবে কেঁপে ওঠে। আমরা যে জীবনকে এত আপন মনে করি, যে দেহকে এত যত্নে বাঁচিয়ে রাখি, যে সম্পর্ক, সম্পদ, মর্যাদা, স্বপ্নকে এত দৃঢ় বলে ধরে নিই—কুরআন তাদের উপর একটি অমোঘ সত্যের হাত রাখে: সবকিছু শেষ পর্যন্ত মাটির দিকে নয়, আল্লাহর দিকে ফেরার পথেই হাঁটে। এখানে মৃত্যু কোনো বিস্ময় নয়; বরং মানবজীবনের নিশ্চিত সীমানা। এই আয়াত হৃদয়কে শেখায়, মৃত্যু কোনো ব্যতিক্রমী বিপর্যয় নয়—এটি সেই দরজা, যেখান দিয়ে প্রতিটি আত্মা অবশেষে রবের সামনে উপস্থিত হবে।
তারপর আল্লাহ বলেন, তিনি তোমাদেরকে মন্দ ও ভালো দ্বারা পরীক্ষা করেন। অর্থাৎ কেবল দুঃখই পরীক্ষা নয়, সুখও পরীক্ষা; কেবল ক্ষতিই নয়, প্রাপ্তিও পরীক্ষা; কেবল রোগ-দুর্দশা নয়, সুস্বাস্থ্য-সচ্ছলতাও পরীক্ষা। জীবনের প্রতিটি মোড়েই বান্দা প্রকাশ পায়—সে কৃতজ্ঞ কি না, ধৈর্যশীল কি না, আল্লাহমুখী কি না। অনেক সময় মানুষ ভাবে, বিপদ এলে আল্লাহর পরীক্ষা শুরু হয়; কিন্তু সম্পদ, ক্ষমতা, প্রশংসা, সুযোগ—এসবও অন্তরের আসল চেহারা বের করে আনে। এ আয়াত তাই আমাদের সহজ ভুল ভেঙে দেয়: দুনিয়া আরামখানা নয়, ইমানের ময়দান।
এই আয়াতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট, দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত শানে নুযূল বর্ণনা নেই; তবে এর বৃহত্তর কুরআনিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত স্পষ্ট। সূরা আল-আম্বিয়া নবীদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যাঁরা তাওহীদের পথে মানুষকে ডেকেছেন, কষ্ট সহ্য করেছেন, আর আল্লাহর ওয়াদার ওপর ভরসা রেখেছেন। সেই ধারার মাঝেই মৃত্যুর অনিবার্যতা ও পরীক্ষার বাস্তবতা উচ্চারিত হচ্ছে—যেন বলা হচ্ছে, নবীদের পথও দুনিয়ার দুঃখ-সুখে ভরা, কিন্তু শেষ গন্তব্য আল্লাহরই দিকে। তাই এই আয়াত আমাদের ঘুম ভাঙায়: যা-ই আসুক, তা স্থায়ী নয়; যা-ই হারাই, তা চূড়ান্ত নয়; কারণ প্রত্যাবর্তন একান্তই আমাদের রবের কাছেই।
মৃত্যুর কথা কুরআন এমনভাবে উচ্চারণ করে, যেন মানুষের অন্তরের ঘুম ভেঙে যায়। আমরা যাকে স্থায়ী মনে করি, তা আসলে ক্ষণস্থায়ী ছায়া; আর যাকে দূরে ভাবি, তা প্রতিদিন আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। এই আয়াত মনে করিয়ে দেয়—জীবনকে যে যত সাজাক, দেহকে যত আগলে রাখুক, আত্মার এক অবধারিত যাত্রা আছে। মৃত্যুর স্বাদ মানে কেবল দেহের অবসান নয়; এ হলো সেই মুহূর্ত, যখন মানুষ নিজের সব বাহ্যিক পরিচয় খুলে ফেলে আল্লাহর সামনে একাকী দাঁড়ায়। তখন পদ, সম্পদ, প্রশংসা, ভয়, সম্পর্ক—কোনোটিই আর আশ্রয় হয় না।
অবশেষে সকল প্রত্যাবর্তন তাঁরই দিকে। এ বাক্যটি হৃদয়ের জন্য এক ভয়ও, আবার এক শান্তিও। ভয়, কারণ আমাদের কোনো গোপনী কিছু নেই; শান্তি, কারণ শেষ গন্তব্য অন্ধকার নয়—বরং পরম বিচার, পরম জ্ঞান, পরম রহমতের দরবার। যে বান্দা এই ফিরে যাওয়াকে স্মরণে রাখে, সে দুনিয়াকে উপাস্য বানায় না; সে জানে, সব অর্জনের শেষ হিসাব আছে, সব কান্নার শেষ শুনানি আছে, আর সব নিঃশ্বাসের শেষ সাক্ষাৎ আছে। তাই এই আয়াত আমাদের বলে: বাঁচো এমনভাবে, যেন মৃত্যু শুধু দূরে নয়, বরং সত্যের দরজা। আর পরীক্ষার মাঝেও এমন হৃদয় রাখো, যা ফিরে যেতে জানে আল্লাহর কাছেই।
প্রত্যেক প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ নেবে—এই ঘোষণা মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা সব ভ্রান্ত নিশ্চয়তাকে নীরবে ভেঙে দেয়। আমরা যাকে স্থায়ী মনে করি, সে স্থায়ী নয়; আমরা যাকে নিজের বলে আঁকড়ে ধরি, তা শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিতেই হবে। মৃত্যু কোনো দূরবর্তী কল্পনা নয়, কোনো অপ্রয়োজনীয় ভাবনাও নয়; সে আমাদের জীবনেরই এক নিশ্চিত সত্য, যা প্রতিটি শ্বাসের ভেতর নীরবে এগিয়ে আসে। তাই যে হৃদয় আল্লাহকে ভুলে জীবনকে চূড়ান্ত মনে করে, সে আসলে ছায়াকে ধরে সূর্যকে অস্বীকার করছে।
তারপর আসে পরীক্ষা—মন্দ ও ভালো, সংকট ও স্বস্তি, অভাব ও প্রাচুর্য, অপমান ও সম্মান—সবই ফিতনা, সবই আল্লাহর সামনে আমাদের অন্তরের সত্যতা প্রকাশের মঞ্চ। বিপদে আমরা কাঁদি; কিন্তু নিয়ামতে কি আমরা কৃতজ্ঞ হই? কষ্ট এলে কি আমরা ভেঙে পড়ি, আর সুখ এলে কি অহংকারে ফুলে উঠি? এই আয়াত সমাজের চেহারাকেও উন্মোচিত করে: যে সমাজ সম্পদে কৃতজ্ঞ নয়, দুর্দশায় ধৈর্যশীল নয়, ক্ষমতায় ন্যায়পরায়ণ নয়—সে সমাজ আসলে পরীক্ষায় ব্যর্থ এক অন্তরেরই বড় রূপ। আল্লাহর দৃষ্টিতে বান্দার মর্যাদা তার বাহ্যিক অবস্থায় নয়, বরং সেই অবস্থায় তার হৃদয়ের অবস্থানে।
এবং শেষ কথা—আমারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। এ বাক্যেই আশঙ্কা আছে, আবার আশ্রয়ও আছে; জবাবদিহির কাঁপন আছে, আবার রবের দিকে ফেরার দরজাও আছে। মানুষ যেখানেই ছুটুক, যাই অর্জন করুক, যাই গোপন করুক, তার পথ শেষ পর্যন্ত আল্লাহরই দরবারে গিয়ে থামে। তাই আজকের জীবন যেন হিসাবহীন উল্লাস না হয়; বরং আত্মজিজ্ঞাসার এক পবিত্র যাত্রা হয়: আমি কি পরীক্ষায় আল্লাহমুখী হচ্ছি? আমার মৃত্যু কি আমাকে জাগাবে? আমার আনন্দ কি আমাকে কৃতজ্ঞ করবে? আমার দুঃখ কি আমাকে আরও কাছে টানবে? যে হৃদয় এই আয়াতকে সত্য বলে গ্রহণ করে, সে দুনিয়ার মোহে হারিয়ে যায় না; সে ফিরে যেতে শেখে—ভেঙে, কেঁপে, কেঁদে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহরই দিকে।
আর জীবন? জীবন তো শুধু সুখের প্রতিশ্রুতি নয়, এটি পরীক্ষার ময়দান। ভালো দিনও যেমন আমাদের প্রকাশ করে, তেমনি মন্দ দিনও; প্রাচুর্য যেমন আমাদের প্রকৃত চেহারা দেখায়, তেমনি সংকটও। কে আল্লাহকে স্মরণ করে কৃতজ্ঞ থাকে, আর কে প্রাপ্তির নেশায় তাঁকে ভুলে যায়—এ সবই প্রকাশ পায় এই পরীক্ষার মধ্যে। তাই যারা কষ্টে নুয়ে পড়েছে, তারা যেন জানে: আল্লাহ তোমাকে পরিত্যাগ করেননি। আর যারা আরামে ডুবে আছে, তারা যেন ভয় পায়: এই আরামও তোমার জন্য এক প্রশ্নপত্র। শেষে আমরা সবাই ফিরবই—কিন্তু কার কাছে ফিরছি, এই সত্যটাই সবকিছু বদলে দেয়।
ফিরে যাওয়া আল্লাহর কাছেই। এই বাক্যেই আছে ভয়, আশা, সান্ত্বনা, আর সিদ্ধান্ত। ভয়—কারণ তাঁর সামনে কিছুই গোপন নয়; আশা—কারণ তাঁর রহমত সব কিছুর উপর বিস্তৃত; সান্ত্বনা—কারণ যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই ফিরিয়ে নেবেন; আর সিদ্ধান্ত—আজই আমি কেমন জীবন গড়ব, কী নিয়ে মরব, কী নিয়ে রবের সামনে দাঁড়াব। হে অন্তর, একটু নরম হও। হে আত্মা, একটু জাগো। যে জীবন অল্প, সেই জীবনের জন্য এত বড় গাফলত কেন? আল্লাহ আমাদের মৃত্যু-সচেতন, পরীক্ষা-সচেতন, প্রত্যাবর্তন-সচেতন বানান; এবং সেই দিনের জন্য প্রস্তুত করুন, যেদিন সত্য ছাড়া আর কিছুই কাজে আসবে না।