লَهُمْ فِيهَا زَفِيرٌۭ وَهُمْ فِيهَا لَا يَسْمَعُونَ—এ এক আয়াত, যেখানে শব্দ আছে, কিন্তু স্বস্তি নেই; আর্তনাদ আছে, কিন্তু মুক্তি নেই। জাহান্নামে তাদের জন্য থাকবে চিৎকার, যাফীরের তীব্র নিঃশ্বাস-আহাজারি, অথচ সেই আগুনেই তারা কিছুই শুনতে পাবে না। মানুষের জীবন তো শুনে-শুনে গড়ে ওঠে: উপদেশ, কুরআন, সতর্কতা, ভাঙা হৃদয়ের কান্না, তওবার ডাক—সবই শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু যে হৃদয় দুনিয়ায় সত্যের ডাককে উপেক্ষা করে, তার জন্য চূড়ান্ত পরিণতিতে নীরবতার এই ভয়াবহতা আরও নির্মম হয়ে ওঠে। তখন চিৎকার থাকবে, কিন্তু সান্ত্বনা থাকবে না; শব্দ থাকবে, কিন্তু সাড়া থাকবে না; উপস্থিতি থাকবে, কিন্তু আশ্রয় থাকবে না।
সূরা আল-আম্বিয়ার এ অংশে আল্লাহ তাআলা কিয়ামত, পুনরুত্থান, জবাবদিহি আর মানুষের গাফিলতির পরিণতি স্মরণ করিয়ে দেন। সূরাটির সামগ্রিক সুরই নবীদের তাওহীদী আহ্বান, মক্কার অবিশ্বাসীদের অস্বীকৃতি, এবং আল্লাহর ক্ষমতা ও রহমতের সামনে মানুষের অসহায়ত্বকে উন্মোচন করে। এ আয়াতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো একক শানে নুযূল নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়; তবে এর প্রসঙ্গ পরিষ্কার—যারা আল্লাহর একত্ব, আখিরাত, এবং রাসূলদের সতর্কবার্তাকে হালকা করে দেখেছে, তাদের জন্য এটি এক কঠিন বাস্তবতা। এখানে শুধু এক শাস্তির ছবি নয়, বরং মানব ইতিহাসের সেই চিরন্তন দ্বন্দ্বও দেখা যায়: নবীদের ডাকে সাড়া দেওয়া, নাকি অহংকারে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া।
এই আয়াত হৃদয়কে জাগিয়ে দেয়, কারণ জাহান্নামের বর্ণনা এখানে শুধুই ভয় দেখানোর জন্য নয়; বরং দয়ার দরজা বন্ধ হওয়ার আগেই তাওবার দরজা খোলা আছে—এই সত্য মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। পৃথিবীতে মানুষ কত কিছুর শব্দে ক্লান্ত হয়, কত কথায় বিরক্ত হয়, কিন্তু কুরআনের আহ্বানকে অনেক সময় তেমন গুরুত্ব দেয় না। অথচ একদিন এমনও আসতে পারে, যখন সে শুনতে চাইবে—কিন্তু শুনতে পাবে না; ডাক শুনবে, কিন্তু জবাব দেওয়ার শক্তি থাকবে না। তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মুমিনের হৃদয় বলে, হে আল্লাহ, আমাদের কানকে সত্যের জন্য জীবিত রাখো, আমাদের অন্তরকে গাফিলতিতে মরতে দিও না, আর আমাদেরকে সেই নীরব পরিণতি থেকে রক্ষা করো, যেখানে আর্তনাদ আছে কিন্তু রহমতের দরজা নেই।
এই আয়াতে যে জাহান্নামের দৃশ্য উঠে আসে, তা কেবল শাস্তির শব্দচিত্র নয়; তা হলো সেই হৃদয়ের চূড়ান্ত উল্টে যাওয়া, যে হৃদয় পৃথিবীতে সত্যের আহ্বান শুনেও নরম হয়নি। দুনিয়ায় মানুষ কত কিছুর শব্দে ব্যস্ত থাকে—প্রশংসা, অভিযোগ, লোভ, ভয়, অহংকার—কিন্তু আল্লাহর ডাককে উপেক্ষা করার অভ্যাস একদিন এমন এক নীরব বিপর্যয়ে রূপ নেয়, যেখানে আর্তনাদ থাকবে, অথচ সাড়া থাকবে না। সেখানে যাফীর, সেই জ্বলন্ত নিঃশ্বাস-চিৎকার, মানুষের অন্তরের সমস্ত ভ্রান্ত আত্মবিশ্বাসকে ছিন্নভিন্ন করে দেবে; কারণ যে কানে কুরআনের নসিহত প্রবেশ করেনি, সে কান আগুনের মধ্যে শুধু নিজের অসহায়তাই শুনবে।
এই আয়াত তাই আমাদের জাগিয়ে তোলে, যেন আমরা এখনই কানকে, হৃদয়কে, আত্মাকে কুরআনের সামনে উন্মুক্ত করি। কারণ আল্লাহর রহমত এমন নয় যে তিনি তওবাকারীর জন্য দরজা বন্ধ করে দেন; বরং তিনি সতর্ক করেন, যাতে মানুষ চূড়ান্ত নীরবতার আগে নিজের ভেতরের গাফিলতিকে ভেঙে ফেলতে পারে। কিয়ামতের ভয় এখানে নির্মম, কিন্তু সেই ভয়ই মুমিনের জন্য রহমতের দরজা—যে ভয় মানুষকে জাগিয়ে তোলে, নরম করে, সিজদায় নামায়, এবং বলে: হে রব, আমি শুনেছি; আমি ফিরছি; আমাকে সেই আগুনের আর্তনাদ থেকে বাঁচান, যেখানে কান থাকবে, কিন্তু সান্ত্বনার একটিও শব্দ থাকবে না।
লَهُمْ فِيهَا زَفِيرٌۭ وَهُمْ فِيهَا لَا يَسْمَعُونَ—এই সংক্ষিপ্ত আয়াতটির ভেতরে এমন এক কেয়ামতের দৃশ্য লুকিয়ে আছে, যেখানে মানুষের সমস্ত অহংকার পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেখানে থাকবে যাফীর, আর্তনাদের ভারী নিঃশ্বাস, অন্তর ফাটানো চিৎকার; কিন্তু সেই আগুনের ভেতরেও কোনো শান্ত সাড়া নেই, কোনো সান্ত্বনার শব্দ নেই। দুনিয়ায় মানুষ কতই না শব্দে ভরে রাখে জীবন—যে কথা শুনতে চায় না, তার জন্যও শব্দ; যে সত্য মানতে চায় না, তার চারদিকে-ও নানারকম কোলাহল। কিন্তু আল্লাহর সামনে যখন হিসাবের সময় আসবে, তখন কোলাহল কাজে দেবে না, অস্বীকার আশ্রয় দেবে না, আর বিলম্বিত তাওবা ফিরিয়ে আনবে না।
এই আয়াত আমাদের হৃদয়কে জাগায় এক কঠিন সত্যে: শ্রবণশক্তি কেবল কানের বিষয় নয়, তা আত্মারও বিষয়। যে হৃদয় দুনিয়ায় কুরআনের ডাকে সাড়া দেয় না, নবীদের তাওহীদী আহ্বানকে গুরুত্ব দেয় না, অন্যায়, গাফলত আর পাপকে হালকা মনে করে—তার জন্য শেষ পরিণতি হতে পারে এমন এক নীরব আগুন, যেখানে চিৎকার আছে কিন্তু উদ্ধার নেই। অথচ আল্লাহর রহমতের দরজা এখনো খোলা; এখনো সিজদায় ফিরে আসা যায়, চোখের পানি দিয়ে গুনাহ ধুয়ে ফেলা যায়, অন্তরকে আবার জীবিত করা যায়। কিয়ামতের ভয় কেবল শাস্তির ভয় নয়, তা ফিরে আসার আহ্বানও। যে আজ নিজেকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহির জন্য প্রস্তুত করবে, তার জন্য এই আয়াত ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে রহমতের দিকেও ইশারা করে—কারণ আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনই আত্মার সত্যিকারের নিরাপত্তা।
দুনিয়ায় মানুষ কত শব্দ নিয়ে বাঁচে—অভিযোগ, হাসি, তর্ক, অহংকার, ব্যস্ততা। কিন্তু কুরআন যখন জানিয়ে দেয়, জাহান্নামে তাদের জন্য থাকবে যাফীর, আর সেখানে তারা কিছুই শুনতে পাবে না, তখন বুঝে যায় শব্দই শেষ কথা নয়। কখনো শব্দের ভেতরেও ভয়াবহ নীরবতা লুকিয়ে থাকে। এ সেই নীরবতা, যেখানে সত্যের ডাক শোনা হয়নি; দোয়ার ফিসফাস অবহেলিত হয়েছে; নবীদের সতর্কবাণীকে ঠাট্টা করা হয়েছে; আর হৃদয় ধীরে ধীরে এমন এক অন্ধত্বে পৌঁছেছে, যেখানে নিজের পরিণতির শব্দও আর মুক্তির পথ খুলে দেয় না।
এই আয়াত আমাদের সামনে কিয়ামতের এক নির্মম আয়না ধরে। আজ যে কান তিলাওয়াত শুনে, উপদেশ শুনে, মসজিদের আহ্বান শুনে, মায়ের চোখের জল শুনে, নিজের বিবেকের কাঁপন শুনে তাওবা করতে পারে—তার জন্য এখনও দরজা খোলা। কিন্তু এই সুযোগ চিরকাল থাকে না। আল্লাহর রহমত প্রশস্ত, তবে অবহেলা করে সেই রহমতের বিপরীতে দাঁড়ানো কত ভয়ংকর! নবীদের মিশন ছিল মানুষকে তাওহীদের দিকে ফেরানো, ক্ষমার দিকে ডাকা, অন্ধকার থেকে আলোয় আনা; আর এই আয়াত সেই ডাকে সাড়া না দেওয়ার শেষ পরিণতির দিকে তাকাতে বাধ্য করে।
তাই আজ যদি অন্তরে সামান্যও নরমতা থাকে, তবে তা আল্লাহর দান জেনে ফিরে আসুন। গুনাহের অভ্যাসকে নিরাপদ ভাববেন না, কারণ জাহান্নামের আর্তনাদ হঠাৎ শুরু হয় না; তা জমতে থাকে অবহেলায়, জমতে থাকে সত্যকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ায়। আল্লাহ আমাদের এমন হৃদয় দান করুন, যা কুরআনের ভয়কে উপেক্ষা করে না, রহমতের আশা হারায় না, আর কিয়ামতের আগে তাওবার দরজা দিয়ে ফিরে আসতে জানে। কারণ সত্যিকারের মুক্তি সেইখানে, যেখানে মানুষ আল্লাহর সামনে নত হয়—আগুনের ভেতর নয়, রহমতের ছায়ায়।