বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে এমন এক সত্য উচ্চারণ করেন, যা মানুষের ব্যস্ততা, স্বপ্ন, পরিকল্পনা আর আত্মপ্রসাদের পর্দা ছিঁড়ে দেয়: মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় নিকটবর্তী। কুরআনের ভাষা এখানে শুধু ভবিষ্যতের একটি ঘটনা জানায় না; বরং হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে। যেন বলা হচ্ছে, যে সময়কে মানুষ দূরে ভেবে নিশ্চিন্ত হয়ে আছে, সেটিই আসলে নিকটবর্তী। আর এই নৈকট্য কেবল ক্যালেন্ডারের হিসাব নয়—এটি মৃত্যুর, কবরের, পুনরুত্থানের, আর আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর নৈকট্য।
আর আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ যখন এমন এক মহান সত্যের দিকে তাকানোর কথা, তখন তারা গাফলতের অন্ধ মসনদে হেলান দিয়ে থাকে। আয়াতে বলা হয়েছে, তারা বেখবর; তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। অর্থাৎ সমস্যা শুধু না-জানা নয়, সমস্যা হলো জেনে-শুনে এড়িয়ে যাওয়া, অন্তরের ডাককে দমন করে রাখা। গাফলত মানুষকে ধীরে ধীরে ভিতর থেকে মেরে ফেলে—সে নামাজের আহ্বান শুনেও সময় পায়, তাওবার সুযোগ দেখেও পিছিয়ে যায়, মৃত্যু স্মরণ করলেও নিজেকে অবিনশ্বর ভাবতে শেখে। এই আয়াত সেই আত্মপ্রবঞ্চনার মুখোশ টেনে খুলে দেয়।
সূরা আল-আম্বিয়ার শুরুতেই এই সতর্কবাণী আসা খুব অর্থবহ। এ সূরা নবী-রাসূলদের কথা বলে, তাওহীদের শাশ্বত আহ্বান জানায়, দোয়ার কান্না ও আল্লাহর রহমতের প্রশস্ততা স্মরণ করায়, আর একই সঙ্গে মানুষকে শেখায় যে দুনিয়ার দৃশ্যমানতা চূড়ান্ত নয়। এই আয়াতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো প্রামাণ্য سبب النزول সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়; তবে এর বৃহত্তর প্রেক্ষাপট হলো মক্কী কুরআনের সেই জাগরণ-ভাষা, যা অবিশ্বাস, অমনোযোগ ও আখিরাত-বিস্মৃতিকে আঘাত করে। নবীদের ইতিহাস, পরীক্ষার কঠিন পথ, আর আল্লাহর অশেষ দয়ার মাঝে এই আয়াত আমাদের অন্তরে একটি কাঁপন জাগিয়ে দেয়: হে মানুষ, হিসাব কাছেই—তুমি কি এখনও ঘুমিয়েই থাকবে?
মানুষের হিসাব নিকটবর্তী—এই ঘোষণা কেবল এক দূরের কিয়ামতের সংবাদ নয়, এটি আজকের জীবনের উপর নেমে আসা এক নীরব বজ্রপাত। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের এই ভ্রান্ত দীর্ঘশ্বাস ভেঙে দেন, যেখানে আমরা মনে করি সময় আছে, সুযোগ আছে, ফিরে আসা পরে হবে। কিন্তু কুরআন আমাদের শেখায়, শেষের দিন কেবল ইতিহাসের কোনো দূর অধ্যায় নয়; তা আমাদের শ্বাসের খুব কাছাকাছি, আমাদের পদক্ষেপের নিচে, আমাদের হৃদয়ের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ দুনিয়ার সাজে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে সে নিজের অস্তিত্বকেই স্থায়ী ভেবে বসে। অথচ মৃত্যু এমন এক সত্য, যা কোনো বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আসে না; আর হিসাব এমন এক বাস্তবতা, যার সামনে মানুষের সব অজুহাত মোমের মতো গলে যায়।
এ আয়াত আমাদের সামনে আয়নার মতো দাঁড়িয়ে বলে: তুমি কীসে এমন মগ্ন যে নিজের শেষকে ভুলে গেলে? যে অন্তর আজ আল্লাহকে স্মরণে কাঁপে, সে-ই বেঁচে যায়; আর যে অন্তর গাফলতের নরম বিছানায় ঘুমিয়ে থাকে, সে জাগে দেরিতে, কখনওবা জাগতেই পারে না। তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা কাঁপি, কারণ এখানে ভয় কেবল শাস্তির নয়—এটি আল্লাহ থেকে দূরে থাকার ভয়, তাঁর সামনে উত্তরহীন দাঁড়ানোর ভয়। আর সেই ভয়ই মুমিনের হৃদয়কে বাঁচায়, তাকে নামাজের দিকে ফেরায়, দোয়ার দিকে ফেরায়, তাওবার দিকে ফেরায়। হিসাব নিকটবর্তী—এই বাক্য হৃদয়ে স্থির হলে জীবন আর হালকা থাকে না; জীবন তখন আমানত হয়ে ওঠে, প্রতিটি দিন হয়ে ওঠে প্রস্তুতি, আর প্রতিটি নিশ্বাস হয়ে ওঠে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের অনুশীলন।
এই আয়াত আমাদেরকে কেবল কিয়ামতের সংবাদ দেয় না, বরং আমাদের ভেতরের ঘুমকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। মানুষ কত সহজে ভাবে—এখনও তো সময় আছে, এখনও তো জীবন পড়ে আছে, এখনও তো তওবার সুযোগ পরে আসবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলেন, হিসাবের সময় নিকটবর্তী। নৈকট্য এখানে শুধু কোনো দূরের মহাপরিণতির কথা নয়; এটি প্রতিটি শ্বাসের সাথে এগিয়ে আসা সত্য। প্রতিটি দিন আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছে, আমরা আসলে স্থায়ী নই। দেহের শক্তি, সম্পদের জৌলুস, সম্পর্কের ভিড়, পরিকল্পনার শব্দ—সবই একদিন থেমে যাবে, আর মানুষ একাকী দাঁড়াবে তার রবের সামনে। সেই দাঁড়ানোর মুহূর্তের আগে যদি হৃদয় না জাগে, তবে গাফলতের চেয়ে ভয়ংকর অন্ধকার আর কী হতে পারে?
সূরা আল-আম্বিয়ার প্রেক্ষাপটে এই সতর্কবাণী আরও গভীর হয়ে ওঠে। নবীগণের জীবন আমাদের শেখায়, দুনিয়া পরীক্ষা; তাওহীদ শেখায়, ভরসা একমাত্র আল্লাহর ওপর; দোয়া শেখায়, অসহায় বান্দা যখন রবকে ডাকে, তখনই উদ্ধার নেমে আসে; আর রহমত শেখায়, আল্লাহ তাঁর বান্দাকে ধ্বংসের জন্য ডাকেন না, বরং জাগাতে ডাকেন। তাই এই আয়াত ভয়ের সঙ্গে আশাও বহন করে। ভয়—কারণ হিসাব আছে, জবাবদিহি আছে, গাফলতের শাস্তি আছে। আশা—কারণ যে আল্লাহ সতর্ক করেন, তিনিই ফিরবার পথও খুলে রাখেন। যে চোখ অশ্রুতে ধুয়ে নেয়, যে হৃদয় ভেঙে পড়ে, যে বান্দা অনুতাপে রবের দিকে ফিরে, তার জন্য রহমতের দরজা বন্ধ হয়ে যায় না।
আজকের সমাজে এই আয়াত যেন আয়নার মতো। বাহ্যিক ব্যস্ততা যত বাড়ে, অন্তরের শুন্যতা ততই গভীর হয়। মানুষ তথ্য জানে, কিন্তু সত্য ভুলে যায়; ভবিষ্যৎ আঁকে, কিন্তু পরিণতি এড়িয়ে যায়; নিজের জন্য পরিকল্পনা করে, কিন্তু নিজের আত্মার হিসাব করে না। অথচ আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর দিনটি কোনো কল্পনা নয়, এটি নিশ্চিত সাক্ষাৎ। সুতরাং এই আয়াত আমাদেরকে নরম করে, জাগিয়ে তোলে, নত করে। আসো, আমরা নিজেদের জিজ্ঞেস করি: আমি কি সত্যিই প্রস্তুত? আমার অন্তর কি ফিরছে, নাকি এখনো মুখ ফিরিয়ে আছে? যে হৃদয় আজই জেগে ওঠে, সে-ই কিয়ামতের নীরব আঘাত থেকে নিরাপদ হওয়ার পথে হাঁটে। আর যে রবকে স্মরণ করে, সে ভয় এবং রহমতের মাঝখানে এমন এক প্রশান্তি পায়, যা পৃথিবীর কোনো ব্যস্ততা দিতে পারে না।
এই গাফলতিই মানুষকে সবচেয়ে বেশি বিপদে ফেলে। কারণ সে মনে করে, এখনও সময় আছে; এখনও বাঁচার সুযোগ আছে; এখনও তাওবা পরে করা যাবে। অথচ আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন, হিসাবের সময় দূরে নয়। মৃত্যুর এক নিঃশ্বাস, কবরের এক নীরবতা, কিয়ামতের এক আহ্বান—এগুলো সবই আমাদের খুব কাছেই। যে হৃদয় আজ জেগে ওঠে, সে-ই সত্যিকার লাভবান; আর যে হৃদয় আজও দুনিয়ার শব্দে ডুবে থাকে, সে নিজের হাতেই নিজের আখিরাতকে দুর্বল করে।
তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা যেন নিজেদেরকে ধোঁকা না দিই। নামাজকে হালকা ভাবা, পাপকে ছোট ভাবা, তাওবাকে পিছিয়ে রাখা, আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি ছাড়া দিন কাটানো—এসবই গাফলতের রূপ। কিন্তু আল্লাহর রহমতও সমান সত্য। তিনি সতর্ক করেন, যাতে মানুষ ধ্বংস না হয়; তিনি মনে করিয়ে দেন, যাতে বান্দা ফিরে আসে। আজ যদি অন্তরে কাঁপন জাগে, আজ যদি চোখ ভিজে, আজ যদি কেউ নরম হয়ে যায়—তবে সেটাই রহমতের দরজা। আর সেই দরজায় দাঁড়িয়ে বান্দা শুধু এটাই বলে: হে আল্লাহ, আমি বেখবর ছিলাম; আমাকে জাগিয়ে দিন, আমাকে ক্ষমা করুন, আমাকে আপনার সামনে লজ্জিত হওয়ার আগেই আপনার দিকে ফিরিয়ে নিন।