কখনো মানুষের জিহ্বা আল্লাহর ফয়সালাকেও তাড়াহুড়ার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চায়। এ আয়াতে রাসূল ﷺ-কে বলা হচ্ছে, আপনি বলে দিন: যদি আমার কাছে থাকত সেই জিনিস, যা তোমরা তাড়াতাড়ি চাইছ, তবে আমার ও তোমাদের মাঝের এই বিবাদ তখনই মীমাংসিত হয়ে যেত। অর্থাৎ সত্যের বিষয়টি মানুষের হাতে, মানুষের মর্জিতে, মানুষের ক্রোধে বা মানুষের দাবিতে চলে না; নবী ﷺ-ও নিজের ক্ষমতায় শাস্তি নামাতে পারেন না। তিনি আল্লাহর বান্দা, আল্লাহর বার্তাবাহক—ফয়সালার মালিক নন। এ বাক্যে নবুয়তের মর্যাদা যেমন উজ্জ্বল, তেমনি মানুষের সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ পায়।
মক্কার মুশরিকরা বহুবার হুমকি-ধমকি, বিদ্রূপ আর চ্যালেঞ্জের ভাষায় বলত, যদি তুমি সত্যবাদী হও তবে আযাব আনো, আজই দেখাও। তারা কিয়ামতের সতর্কবাণী, শিরকের পরিণতি, জুলুমের ভয়াবহতা—এসব সবকিছুকে যেন এক মুহূর্তের নাট্যদৃশ্যে দেখতে চাইত। কিন্তু আল্লাহর নীতি এমন নয় যে, অবিশ্বাসী চ্যালেঞ্জ করলেই আকাশ ফেটে শাস্তি নেমে আসবে। কুরআন তাদের এই তাড়াহুড়ার ভেতরকার অসততা উন্মোচন করে দেয়: তারা হেদায়েত চাইছে না, তারা পরীক্ষা চাইছে; দলিল চাইছে না, তারা বিদ্রূপ চাইছে।
আর শেষ বাক্যটি হৃদয়ে শীতল-তপ্ত দুই আগুন একসঙ্গে জ্বেলে দেয়: আল্লাহ জালেমদের সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমাণে অবহিত। যে জুলুম প্রকাশ্যে হয়, তিনি তা জানেন; যে জুলুম অন্তরে লুকিয়ে থাকে, তিনি তাও জানেন; যে শিরককে মানুষ সংস্কৃতি বলে ঢেকে রাখে, তাও তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়। এই আয়াত তাই শুধু হুমকি নয়, এক গভীর স্বস্তিও—কারণ দুনিয়ার আদালত কখনো অন্ধ হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর আদালত নয়। তিনি হিকমতের সাথে বিলম্ব করেন, আর তাঁর বিলম্বে অবহেলা নেই; বরং সেই বিলম্বের ভেতরেই জালেমের জন্য সুযোগ, মুমিনের জন্য ধৈর্য, এবং শেষ বিচারের জন্য অখণ্ড প্রস্তুতি লুকিয়ে থাকে।
মানুষ যখন আযাবকে তামাশার মতো ডাকে, তখন সে আসলে সত্যকে আহ্বান করে না; সে আল্লাহর ধৈর্যকে পরীক্ষা করতে চায়। এই আয়াতের ভেতর দিয়ে কুরআন সেই অন্ধ তাড়াহুড়ার মুখোশ খুলে দেয়। নবী ﷺ-কে বলা হচ্ছে, আপনি বলে দিন—যদি আমার হাতে থাকত তোমাদের চাওয়া সেই শাস্তি, তবে বিবাদের ফয়সালা ইতিমধ্যেই হয়ে যেত। কিন্তু নবুয়ত কোনো স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা নয়, কোনো জাদুকরি তলোয়ারও নয়; তা হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পবিত্র আমানত। বান্দা শুধু আহ্বান করেন, হুকুম করেন না। এ বাক্যে একদিকে রাসূল ﷺ-এর নির্ভেজাল দাসত্বের মর্যাদা উজ্জ্বল, অন্যদিকে মানুষের এই সীমাবদ্ধতা ভয়ংকরভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—আমরা চাই বলেই সবকিছু আমাদের হাতে এসে যাবে, এমন অহংকারই জুলুমের শেকড়।
কখনো কখনো মানুষের মনে হয়, যদি সত্যিই শাস্তি আসত, তবে সব প্রশ্ন চিরতরে মিটে যেত। কিন্তু কুরআন শেখায়—ফয়সালা মানুষের তাড়নায় নয়, আল্লাহর ইচ্ছায়, আল্লাহর জ্ঞানে, আল্লাহর নির্ধারিত সময়ে। এই বিলম্বে অবকাশ আছে, কিন্তু নিরাপত্তা নেই; সুযোগ আছে, কিন্তু শিথিলতা নেই। যে হৃদয় ঈমানের আলোয় জেগে থাকে, সে জানে আল্লাহর দেরি মানে অবহেলা নয়; বরং সেটা এমন এক হিকমত, যেখানে তাওবার দরজা খোলা থাকে, সত্যের আহ্বান বারবার পৌঁছে যায়, আর জালেম নিজের অন্তরের মধ্যেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য জমা করতে থাকে। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়—তাড়াহুড়া নয়, তাওবা; চ্যালেঞ্জ নয়, আত্মসমর্পণ; জেদের জবাব নয়, আল্লাহর ফয়সালার সামনে নত হওয়া।
মানুষের অন্তর অনেক সময় এমন এক তাড়নার রোগে আক্রান্ত হয়, যেখানে সে সত্য বোঝার আগেই তার ফল দেখতে চায়। কিন্তু এ আয়াত আমাদের শিখিয়ে দেয়: সত্যের বিচার মানুষের আবেগে হয় না, আল্লাহর হিকমতে হয়। নবী ﷺ-কে বলা হয়েছে, আপনি ঘোষণা করুন—যদি সেই শাস্তি বা ফয়সালা আমার হাতে থাকত, যা তোমরা তাড়াহুড়ো করে চাইছ, তবে আমার এবং তোমাদের মাঝে এই বিরোধ অনেক আগেই শেষ হয়ে যেত। অর্থাৎ রাসূল ﷺ কোনো ইচ্ছাকৃত বিলম্বকারী নন, আর কোনো মানবিক অক্ষমতার কারণে সত্য পিছিয়ে নেই; তিনি আল্লাহর আদেশের অধীন। এই এক বাক্যে নবুয়তের মহিমা যেমন প্রতিষ্ঠিত হয়, তেমনি মানুষের সীমারেখাও স্পষ্ট হয়ে যায়। বান্দা চাইলে আসমানের দরজা জোর করে খুলতে পারে না; তাকে অপেক্ষা করতে হয়, যেমন হৃদয়কে অপেক্ষা করতে হয় তওবার জন্য, আর সমাজকে অপেক্ষা করতে হয় আল্লাহর সিদ্ধান্তের জন্য।
এখানে জালেমদের জন্য একটি অদৃশ্য কিন্তু নিশ্চিত সতর্কবাণী আছে। তারা মনে করে, ত্বরিত শাস্তি না এলে বুঝি তাদের দাবি সত্য, তাদের অস্বীকৃতি নিরাপদ। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান মানুষের হিসাবের মতো নয়। তিনি জালেমদের সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত—তাদের কথা, নীরবতা, ছল, অহংকার, অন্তরের লুকোনো বিদ্রোহ, সবই তাঁর সামনে উন্মুক্ত। মানুষের চোখ অনেক কিছু দেখে না; সমাজ অনেক সময় অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়; কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে কিছুই যায় না। তাই এই আয়াত আমাদের ভিতরকে কাঁপিয়ে দেয়: আমি কি এমন জুলুমের দিকে যাচ্ছি, যা আপাতত ধরা পড়ে না, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞানে জমা হতে হতে একদিন আমার বিপর্যয় হয়ে উঠবে? শিরক, অবাধ্যতা, অন্যের হক নষ্ট করা, সত্য জেনেও তা অস্বীকার করা—এসবের পেছনে যে হৃদয়ের অন্ধকার কাজ করে, আল্লাহ তা জানেন।
এই বাক্যটি তাই শুধু মুশরিকদের জবাব নয়, আমাদের আত্মারও আয়না। আমরা অনেক সময় আল্লাহর ফয়সালা চিরস্থায়ী ধৈর্যের ভেতর দেখতে চাই না; চাই তা তৎক্ষণাৎ, আমাদের পছন্দমতো, আমাদের ভাষায়। কিন্তু মুমিন জানে, বিলম্বও কখনো দেরি নয়—তা হতে পারে সুযোগ, পরীক্ষা, পরিশুদ্ধি। আর জালেমের জন্য সেই বিলম্ব হতে পারে আরও বড় অবকাশ, যাতে তার দলিল আরও পূর্ণ হয়, তার গাফিলতি আরও স্পষ্ট হয়, এবং শেষ ফয়সালা আরও ন্যায়সঙ্গত হয়ে ওঠে। তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে অন্তরকে বলতে হয়: হে আমার রব, আমাকে ত্বরাহীন কুরআনের পথে রাখুন, আমাকে নিজের নাফসের তাড়াহুড়া থেকে রক্ষা করুন, আমাকে এমন জুলুম থেকে বাঁচান যা আমি নিজেই বুঝি না। কারণ শেষ বিচারে শান্তি সেই হৃদয়ের, যে জানে—আল্লাহ জালেমদেরও জানেন, এবং মজলুমের কান্নাও তাঁর অগোচর নয়।
মানুষের তাড়াহুড়ায় যদি আল্লাহর দরবার খুলে যেত, তবে কেউই রেহাই পেত না। কারণ আমরা প্রতিনিয়তই নিজের ভেতরে জুলুম বয়ে বেড়াই—অবহেলা, অহংকার, সত্য জেনেও পাশ কাটিয়ে যাওয়া, নিজের খেয়ালকে প্রভু বানিয়ে ফেলা। এই আয়াত যেন আমাদের কানে খুব ধীরে, খুব ভারী স্বরে বলে: ফয়সালা মানুষের হাতে দিলে তা বহু আগেই শেষ হয়ে যেত; কিন্তু আল্লাহ তা স্থগিত রাখেন হিকমতের সাথে, সুযোগ দেন তওবার, সময় দেন ফিরে আসার। এই বিলম্ব শাস্তির দুর্বলতা নয়—এটা রহমতের আরেক নাম। আর এই রহমতের মাঝেও ভয় জেগে থাকে, কারণ যিনি দেরি করান, তিনি অজানা নন; তিনি জালেমদের অন্তর, তাদের চক্রান্ত, তাদের ভেতরের অন্ধকার—সবই জানেন।
আল্লাহ জালেমদের সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমাণে অবহিত—এই একটি বাক্যেই লুকিয়ে আছে ভয়ের সাগর আর আশার আলো। জালিম কখনো ভাবতে পারে না, তার ফিসফিস, তার সাজানো যুক্তি, তার লুকানো বিদ্রূপ, তার অন্তরের কুৎসিত আকাঙ্ক্ষা—কোনোটাই আড়ালে নেই। মানুষের আদালতে অনেক কিছু হারিয়ে যায়, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞানের আদালতে কিছুই হারায় না। তাই মুমিনের কাজ আযাবকে ত্বরান্বিত করা নয়, বরং নিজের হৃদয়কে ত্বরিত তওবায় নরম করা। যে দিন মানুষ বুঝবে—আল্লাহর বিলম্বও এক ধরনের বিচার, সে দিন তার বুক থেকে উদ্ধত দাবি ঝরে পড়বে, আর সে সিজদায় পড়ে বলবে: হে রব, তুমি জানো, আমি কতটাই না দুর্বল; আমাকে আমার জুলুম থেকে বাঁচাও, আমার অন্তরকে তোমার দিকে ফিরিয়ে নাও।