মানুষ যখন নিজের ইচ্ছাকে সত্যের পোশাক পরাতে চায়, তখন সে আল্লাহর নামও নিজের পক্ষে টেনে আনে। এই আয়াতে মুশরিকদের সেই পুরোনো, ক্লান্ত, কিন্তু ভেঙে না-যাওয়া অজুহাতকে আল্লাহ উন্মোচিত করছেন: যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে আমরা শিরক করতাম না, আমাদের পূর্বপুরুষরাও করত না, আর আমরা কোনো কিছু হারামও করতাম না। যেন ভুলকে জায়েয করার জন্য কেবল “আল্লাহর ইচ্ছা” শব্দটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু কুরআন জানিয়ে দেয়, ইচ্ছা আর সন্তুষ্টি এক নয়; সংঘটন আর অনুমোদন এক নয়। কোনো পাপ ঘটতে পারা মানেই তা প্রিয় ও গ্রহণযোগ্য হয়ে যাওয়া নয়। মানুষের বিভ্রান্তি এখানেই—সে ঘটনার পেছনে তাকিয়ে নিয়তির নাম নেয়, কিন্তু ঘটনার নৈতিক দায়কে এড়িয়ে যায়।

আল্লাহ তাআলা তাদের এই কথাকে মিথ্যা ও অনুমানভিত্তিক ঘোষণা করেছেন। তারা জ্ঞান দাবি করে না, প্রমাণও দেখাতে পারে না; তারা কেবল ধারণার পেছনে দৌড়ায়, আর ধারণাকে সত্যের সমান করে ফেলে। এর আগে যাদের হাতে সত্যের আলো এসেছিল, তারাও এমনই অজুহাত দাঁড় করিয়েছিল; শেষ পর্যন্ত তারা আল্লাহর পাকড়াও স্বাদ পেয়েছে। অর্থাৎ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—অহংকার, প্রথা, বাপ-দাদার উত্তরাধিকার, কিংবা সমাজের চলতি রীতি কোনো কিছুই সত্যের মানদণ্ড নয়। হালাল-হারাম নির্ধারণের অধিকার মানুষের আবেগে নয়, আল্লাহর জ্ঞানে; বিধানের ভিত্তি আন্দাজে নয়, ওহিতে। তাই নবীর মুখ দিয়ে আল্লাহ প্রশ্ন করছেন: তোমাদের কাছে কি এমন কোনো নিশ্চিত জ্ঞান আছে, যা তোমরা আমাদের সামনে বের করতে পারো? এই প্রশ্ন শুধু মুশরিকদের নয়; প্রতিটি যুগের মানুষকে জাগিয়ে তোলে—তুমি কি সত্যিই জান, নাকি কেবল অভ্যাসকে বিশ্বাস বলে চালাচ্ছ?

মানুষের ভেতরকার সবচেয়ে পুরোনো প্রতারণা এই: সে ভুল করে, আবার সেই ভুলের গায়ে আল্লাহর নাম লিখে দেয়। সূরা আল-আনআমের এই আয়াতে মুশরিকদের মুখে যে কথা উঠে আসে—“আল্লাহ চাইলে আমরা শিরক করতাম না”—তা কেবল একটি বক্তব্য নয়, বরং সত্যকে আড়াল করার এক মরিয়া চেষ্টা। কিন্তু কুরআন যেন আমাদের শিখিয়ে দেয়, আল্লাহর ইচ্ছা আর আল্লাহর সন্তুষ্টি এক জিনিস নয়; কিছুর সংঘটিত হওয়া মানেই তা ন্যায্য হয়ে যায় না। তিনি কাউকে অবকাশ দেন, পরীক্ষার ময়দান প্রশস্ত রাখেন, কিন্তু তাই বলে বাতিলকে সত্যের পোশাক পরিয়ে দেন না। মানুষের পাপ যখন নিজের দায় স্বীকার করতে চায় না, তখন সে তাকদীরের আড়ালে লুকাতে চায়; অথচ এই আয়াত সেই আড়াল ছিঁড়ে ফেলে দেয়।

আল্লাহ তাআলা তাদের যুক্তিকে এক আঘাতে ভেঙে দেন: তোমাদের কাছে কি কোনো জ্ঞান আছে? যদি থাকে, তবে তা সামনে আনো। এখানে কুরআনের নীরব কিন্তু জ্বালাময়ী প্রশ্ন হলো—অন্ধ ধারণা কি কখনো হালাল-হারামের মাপকাঠি হতে পারে? বাপ-দাদার অভ্যাস, সমাজের চল, কালের জীর্ণ রেওয়াজ, কিংবা নিজের প্রবৃত্তির পছন্দ—এসব কি ওহির বিকল্প হতে পারে? না। কারণ দ্বীনের ভিত্তি আন্দাজ নয়, জ্ঞান; জ্ঞানও নয় এমন কোনো মানুষের খেয়াল, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত সত্য। যে হৃদয় নিজের ইচ্ছাকে বিচারক বানায়, সে শেষ পর্যন্ত সত্যকে অবজ্ঞা করে; আর যে হৃদয় ওহির সামনে নত হয়, সে-ই মুক্ত হয় অন্ধ অনুকরণের শৃঙ্খল থেকে।

আয়াতটি শুধু একদল মুশরিকের জবাব নয়, আজও প্রতিটি যুগের জন্য আয়না। আমরা কি কখনো পছন্দের গোনাহকে বৈধতা দিতে “আল্লাহই তো সব চান” বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিই না? আমরা কি কখনো প্রমাণ ছাড়া, কেবল প্রচলন আর অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে ধর্মকে বাঁকিয়ে ফেলি না? এই আয়াত আমাদের হৃদয়ে কাঁপন জাগায়, কারণ এটি স্মরণ করিয়ে দেয়—আল্লাহর আদালতে অজুহাত কাজ করবে না, আন্দাজ গ্রহণযোগ্য হবে না। সেখানে কেবল সত্য, জ্ঞান, এবং ওহির সামনে আত্মসমর্পণই টিকে থাকবে। তাই তাওহীদ কেবল মুখের স্বীকারোক্তি নয়; তা হলো আল্লাহকে একমাত্র বিধানদাতা, একমাত্র হক্বের মানদণ্ড, আর একমাত্র আশ্রয়স্থল হিসেবে মেনে নেওয়া।
মানুষ যখন নিজের ভুলকে টিকিয়ে রাখতে চায়, তখন সে আল্লাহর নামকে ঢাল বানায়। এই আয়াতে মুশরিকদের মুখে সেই চিরচেনা কথাই শোনা যায়—আল্লাহ যদি না চাইতেন, তবে আমরা শিরক করতাম না, পূর্বপুরুষরাও করত না, হারামও বানাতাম না। কিন্তু কুরআন যেন আমাদের বুকের ভেতরকার অন্ধকারকে খুলে ধরে জানিয়ে দেয়: আল্লাহর ইচ্ছা আর তাঁর সন্তুষ্টি এক নয়; কোনো পাপ ঘটতে পারা আর তা সত্য হয়ে যাওয়া এক নয়। ঘটনার অস্তিত্বকে নৈতিক বৈধতা দিয়ে ঢেকে ফেলা মানুষের পুরোনো প্রতারণা, আর এই প্রতারণার শিকড় কেবল মূর্তির মধ্যে নয়—মানুষের নিজের ভিতরেও। যখন মন সত্যকে মানতে চায় না, তখন সে নিয়তিকে অজুহাত বানায়, আর নিজের দায়কে আল্লাহর নামে ধুয়ে ফেলতে চায়।

আয়াতটি আমাদের সমাজকেও আয়নার মতো দেখায়। কত কুসংস্কার, কত বংশগত রীতি, কত হারাম-হালালের বিকৃত ধারণা উত্তরাধিকারের নামে বয়ে চলেছে; আর মানুষ বলে, এ তো আমাদের রেওয়াজ, এ তো পুরোনো পথ, এ তো বহুদিনের বিশ্বাস। কিন্তু আল্লাহ প্রশ্ন ছুড়ে দেন—তোমাদের কাছে কি কোনো জ্ঞান আছে, যা তোমরা আমাদের সামনে বের করতে পারো? এই প্রশ্নে অহংকার নত হয়ে যায়, কারণ সত্যের সামনে দাঁড়ালে আন্দাজের কোনো ওজন থাকে না। যে ধর্ম ও বিধান ওহির আলো থেকে আসে না, তা যতই প্রাচীন হোক, ততই ভঙ্গুর। আর যে হৃদয় কেবল ধারণার ওপর চলে, সে একদিন নিজেরই বানানো অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

এই আয়াতের ভেতর ভয়ের সঙ্গে আশা জাগে। ভয়, কারণ শিরকের অজুহাত মানুষকে শাস্তির দোরগোড়ায় নিয়ে যায়; আর আশা, কারণ আল্লাহ এখনো বান্দাকে প্রশ্ন করছেন, এখনো সত্যের দরজা খুলে দিচ্ছেন, এখনো তওবার আহ্বান শোনাচ্ছেন। এটি শুধু তাদের জন্য নয়, আমাদের জন্যও—যাতে আমরা নিজের প্রবৃত্তিকে ধর্মের মুখোশ না পরাই, নিজের পছন্দকে আসমানি সিদ্ধান্তের মতো উপস্থাপন না করি। হেদায়েতের পথ সেখানে, যেখানে মানুষ অকুণ্ঠভাবে স্বীকার করে: আমি জানি না; আল্লাহ জানেন। আমি অনুমান করি না; আমি ওহির কাছে নত হই। যে অন্তর এই স্বীকারোক্তিতে পৌঁছে, সে তাওহীদের দিকে ফেরে, এবং ফেরার সেই মুহূর্তেই আত্মা তার সত্য ঠিকানা স্মরণ করে—আল্লাহর দিকে।

মানুষের অন্তর কত সহজে নিজের পছন্দকে আল্লাহর ইচ্ছার নাম পরিয়ে দেয়। যে গুনাহকে সে ছাড়তে চায় না, যে রীতিকে সে ভাঙতে চায় না, যে হারামকে সে আঁকড়ে থাকতে চায়, তার পক্ষেই সে বলে—আল্লাহ যদি না চাইতেন, তবে এমন হতো না। কিন্তু এই আয়াত আমাদের চোখের সামনে এক ভয়াবহ সত্য খুলে দেয়: আল্লাহর ইচ্ছা সবকিছুকে ঘিরে আছে, অথচ মানুষের মিথ্যা অজুহাতকে তা সৎ করে না। ঘটনা ঘটেছে বলে তা ন্যায় হয়ে যায় না; প্রচলন আছে বলে তা সত্য হয়ে যায় না; বাপ-দাদার পথ আছে বলে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। সত্যের মানদণ্ড মানুষ নয়, ওহি।

আরও গভীর করে বললে, এই আয়াত যেন হৃদয়ের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক ভয়ংকর প্রবণতাকে ধরে ফেলে—আমরা জ্ঞান না থাকলেও তর্ক করি, প্রমাণ না থাকলেও আত্মপক্ষ সমর্থন করি, আর অনুমানকে বিশ্বাসের পোশাক পরাই। আল্লাহ প্রশ্ন করছেন: তোমাদের কাছে কি কোনো প্রমাণ আছে? এই প্রশ্ন শুধু মুশরিকদের জন্য নয়; এটি প্রত্যেক যুগের মানুষের অন্তরে নেমে আসে। কত মত, কত অভ্যাস, কত আপস—সবই যদি কেবল ধারনা হয়, তবে সেগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে কেমন করে বান্দা আল্লাহর সামনে নিশ্চিন্ত হয়? শিরকের পথ হোক বা হালাল-হারামের খেলাচ্ছলে বদল, সত্য সবসময়ই ওহির আলোতে ধরা পড়ে; আর অন্ধকারের সবচেয়ে পরিচিত ভাষা হলো অনুমান।

তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে হৃদয়কে ছোট করতে হয়। শিরকের বড়াই, আত্মপ্রবঞ্চনার জেদ, আর বাপ-দাদার অন্ধ অনুসরণ—সবই একদিন আল্লাহর পাকড়াওয়ের সামনে তুচ্ছ হয়ে যাবে। মানুষ হয়তো অনেক কথা বলতে পারে, কিন্তু রবের সামনে দাঁড়িয়ে অজুহাতের শব্দগুলো মাটির মতো ঝরে পড়ে। আজই যদি অন্তর নরম না হয়, যদি তাওহীদের সামনে অহংকার ভেঙে না পড়ে, তবে কাল আক্ষেপই হবে শেষ আশ্রয়। হে আল্লাহ, আমাদেরকে অনুমানের অন্ধকার থেকে বের করে আপনার স্পষ্ট ওহির কাছে ফিরিয়ে নিন; আমাদের অন্তরকে সত্যের কাছে নরম করুন, আর আমাদের জীবনকে শিরক, জেদ ও আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে পবিত্র করুন।